ডিজিটাল বিভাজন ও নারী উদ্যোক্তা: স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে বাধা কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল বিভাজন ও নারী উদ্যোক্তা: স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে বাধা কোথায়?

রেহানা পারভীন  avatar   
রেহানা পারভীন
ডিজিটাল বিভাজন ও নারী উদ্যোক্তা: স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে বাধা কোথায়?
ডিজিটাল বিভাজন ও নারী উদ্যোক্তা: স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে বাধা কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এর একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, দেশের নারী উদ্যোক্তাদের মাত্র ২১ শতাংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্য...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এর একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, দেশের নারী উদ্যোক্তাদের মাত্র ২১ শতাংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করেন। এই পরিসংখ্যান স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ডিজিটাল বিভাজন যে কতটা গভীর সংকট তৈরি করছে, তা স্পষ্ট করে তোলে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য, যারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম, তাদের ডিজিটাল দক্ষতার অভাব এবং ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের সীমাবদ্ধতা এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং এর সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু, প্রান্তিক ও গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, ইন্টারনেট ব্যবহারের উচ্চ খরচ এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইসের অপ্রাপ্যতা এই লক্ষ্য অর্জনে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ডিজিটাল বিভাজনের অন্যতম কারণ হলো উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অপ্রতুলতা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম। যদিও ইউজিসি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বৃত্তি ও প্রণোদনা চালু করেছে, কিন্তু এই সকল উদ্যোগের সুফল গ্রামীণ বা সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডেটা সায়েন্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা সাইবার সিকিউরিটির মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কোর্সে নারীর অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য। এর ফলে, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও অনেক নারী উদ্যোক্তা ডিজিটাল অর্থনীতির সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না। তাদের কাছে ডিজিটাল বিপণন, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা বা অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের মতো অত্যাবশ্যকীয় দক্ষতাগুলো অধরা থেকে যাচ্ছে। এই জ্ঞানগত শূন্যতা তাদের ব্যবসার পরিধি বিস্তার এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার ক্ষেত্রে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করছে।

ডিজিটাল বিভাজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের অভাব। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করলেও, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল দক্ষতা বিষয়ক সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যাপকতা এখনও অপ্রতুল। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার নারীরা, যারা হস্তশিল্প, কুটির শিল্প বা কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগের সাথে জড়িত, তাদের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার এবং ই-কমার্সের ব্যবহারিক জ্ঞান অত্যন্ত জরুরি। দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রকল্প সেপ (SEIP) এর অধীনে কিছু ডিজিটাল দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, এর লক্ষ্যমাত্রা এবং ভৌগোলিক বিস্তৃতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু শহুরে প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দেয়, যা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের বাস্তব চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এছাড়া, প্রশিক্ষণের পর প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস বা ইন্টারনেট প্যাকেজের ব্যয়ভার বহন করাও তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, যা প্রশিক্ষণের কার্যকারিতাকে সীমিত করে ফেলে। ফলস্বরূপ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরাও তাদের অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে একটি বড় বাধা।

প্রতিষ্ঠানের নাম কর্মসূচি/উদ্যোগ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রভাব (২০২১-২০২৩)
ইউজিসি (UGC) তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি ও প্রণোদনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদে নারী শিক্ষার্থীর হার ১৮% (২০২১-২২)
এনএসডিএ (NSDA) জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি (২০১১) বাস্তবায়ন ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণে নারী অংশগ্রহণকারী ৩০% (২০২৩)
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ই-কমার্স ও ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণে নারী অংশগ্রহণকারী ২২% (২০২২)
সেপ (SEIP) দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ডিজিটাল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রশিক্ষণে নারী অংশগ্রহণকারী ৩৫% (২০২৩)
ব্যানবেইস (BANBEIS) শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান মাধ্যমিক স্তরে আইসিটি শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর হার ৫১% (২০২২)

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২১-২২), এনএসডিএ বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর পরিসংখ্যান (২০২২), সেপ প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন (২০২৩), ব্যানবেইস শিক্ষা পরিসংখ্যান (২০২২)।

সুপারিশ

  • ইউজিসি-কে (University Grants Commission) নির্দেশনা দিতে হবে যেন তারা প্রতিটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ই-কমার্স ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষায়িত সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে। এই কোর্সগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষণ এবং সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফের ব্যবস্থা করতে হবে, যা 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০' এর আলোকে বাস্তবায়িত হবে।
  • এনএসডিএ (National Skills Development Authority) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে যৌথভাবে 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১' এর অধীনে একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এই প্রকল্পের আওতায়, দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে অন্তত একটি করে 'ডিজিটাল নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' স্থাপন করতে হবে, যেখানে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী সফল নারী উদ্যোক্তাদের স্বল্পমূল্যে বা কিস্তিতে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস (ল্যাপটপ/ট্যাবলেট) সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ব্যানবেইস (Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics) এর তথ্যের ভিত্তিতে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে 'ডিজিটাল সাক্ষরতা'কে একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং 'জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)' এর মাধ্যমে এর সিলেবাস আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর সহায়তায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করতে হবে, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের আধুনিক ডিজিটাল টুলস ও প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করাতে পারেন এবং ভবিষ্যতে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করতে পারেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা পারভীন

রেহানা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator