পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: সম্ভাবনা ম্লান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: সম্ভাবনা ম্লান

তৌসিফ রহমান  avatar   
তৌসিফ রহমান
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: সম্ভাবনা ম্লান
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: সম্ভাবনা ম্লান
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনার আধার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কালো ছায়ায় এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ম্লান হয়ে যা...

বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনার আধার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কালো ছায়ায় এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এ খাত তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে চলমান অনিয়মের চিত্র, যা দেশের ঐতিহ্য ও পর্যটন শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানার বিরুদ্ধে গত সাত বছর ধরে 'দুর্নীতির সাম্রাজ্য' গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। তিনি খনন কাজে অদক্ষ শ্রমিক ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে মাস্টার রোল কর্মচারীদের কাছ থেকে ৩-৪ লাখ টাকা নিয়ে বারবার ছাঁটাই ও নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এমনকি সাবেক মন্ত্রী-আমলাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের জেরে তার বিরুদ্ধে আনা লিখিত অভিযোগগুলোও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নীলফামারীতে এডিবির অর্থায়নে নির্মিত একটি জাদুঘর ছয় বছর ধরে উদ্বোধন বা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি, যা সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। দেশের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মহাস্থানগড়ও দখলদারিত্বের শিকার; মূল দুর্গ এলাকার ভেতরে প্রায় ৮০০ অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের জমি দখলের দাবির মুখে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঐতিহ্য সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে এই ঐতিহাসিক স্থানটির জৌলুস হারাচ্ছে। এছাড়া, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খননকাজে সীমাবদ্ধ এবং গবেষণায় পিছিয়ে রয়েছে, যা দেশের ৫১৭টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও ২২টি জাদুঘরের সঠিক ব্যবস্থাপনার পথে অন্তরায়। সিলেটের ১৭টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তিও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে, কারণ সেখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো আঞ্চলিক কার্যালয় নেই এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কার্যালয় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এটি দেখভাল করে। লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল এবং ষাট গম্বুজ মসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোও অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও নগরায়ণের প্রভাবে সংকটের মুখে।

পর্যটন খাতেও সিন্ডিকেট, হয়রানি এবং অব্যবস্থাপনা প্রকট রূপ ধারণ করেছে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোতে স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলো নৌকা, অটোরিকশা, সিএনজি এবং হোটেল ভাড়া নিয়ে পর্যটকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। সিলেটে রাতারগুল ও ভোলাগঞ্জের মতো স্থানেও পর্যটকদের হয়রানির শিকার হতে হয়। দুর্বল অবকাঠামো, সীমিত প্রচার, দক্ষ জনবলের অভাব, বিদেশি পর্যটকদের জন্য জটিল ভিসা প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবার নিম্নমান পর্যটন খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে; জাফলংয়ে পর্যটকদের ওপর হামলা এবং ভোলার ইলিশাবাড়িতে চাঁদাবাজির ঘটনা পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দিনাজপুরের পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, কর্মচারীদের হয়রানি এবং নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে তিনি কার্ড ছাড়া অতিথি রাখা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য ব্ল্যাকমেইল করার মতো কাজ করেছেন। এমনকি বান্দরবানের থানচিতে পর্যটকদের সাথে অসদাচরণের অভিযোগে একজন গাইডকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যা পর্যটন খাতে শৃঙ্খলা ও আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরে।

অপরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটিকে 'ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা সরকারি অর্থে পরিচালিত হলেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে, পর্যটন করপোরেশন নিজস্ব আয়ে চলে। দুটি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পর্যটন খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকার জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৩ শতাংশ থেকে ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, এই লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট।

সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন: ১. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং পর্যটন বোর্ডের মতো সংস্থাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং দুর্নীতির অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ২. মহাস্থানগড়সহ সকল প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা ও খননকাজে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা। ৩. পর্যটন স্পটগুলোতে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্যুরিস্ট পুলিশ ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা। ৪. পর্যটন খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে হোটেল-মোটেল ও গাইডদের জন্য কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন করা। ৫. পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে উৎসাহিত করা এবং সেন্টমার্টিনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় যেকোনো অপরিকল্পিত নির্মাণ কাজ বন্ধ করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। ৬. পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে গতিশীলতা আনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) মাধ্যমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌসিফ রহমান

তৌসিফ রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ।

Walang nakitang komento


News Card Generator