স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় দুর্নীতির করাল গ্রাস: জনস্বাস্থ্যের চরম… | আই নিউজ বিডি

স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় দুর্নীতির করাল গ্রাস: জনস্বাস্থ্যের চরম অবহেলা..

রেহনুমা তাবাসসুম  avatar   
রেহনুমা তাবাসসুম
স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় দুর্নীতির করাল গ্রাস: জনস্বাস্থ্যের চরম অবহেলা..
স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় দুর্নীতির করাল গ্রাস: জনস্বাস্থ্যের চরম অবহেলা..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের এক জটিল জালে আবদ্ধ। বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা জনস্বা.....

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের এক জটিল জালে আবদ্ধ। বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকারকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এই খাতের গভীর ক্ষতগুলো বারবার উন্মোচিত হয়েছে, যেখানে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমনকি, বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন যে, দুর্নীতির উদ্দেশ্যেই ক্রয় প্রক্রিয়ায় ফাঁকফোকর রাখা হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালেই স্বাস্থ্য খাতের ১১টি প্রধান দুর্নীতির ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছিল, যার মধ্যে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ অন্যতম। দুদকের প্রতিবেদনে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা, ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, সরবরাহ বা মেরামত না করেই বিল পরিশোধ এবং সরকারি ওষুধ কালোবাজারে বিক্রির মতো গুরুতর অনিয়মের কথা উঠে আসে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়েও এই চিত্র পাল্টায়নি; বরং কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রী আইন ও বিধি না মেনেই ক্রয় করেছিল, যেখানে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি পর্যন্ত ছিল না এবং পণ্যের মান বা ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হয়নি। এসব অনিয়মের ফলে কেনা অনেক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে, কারণ সেগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ করা হয়নি। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, গত ১৫ বছরে অপরিকল্পিত কেনাকাটা ও দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ে আছে।

সাম্প্রতিক সময়েও দুর্নীতির এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটার কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যেখানে দুদক তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেলের বদলে নিম্নমানের কম্পিউটার সরবরাহ করে প্রায় ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়াও, ৬ হাজার জিপিডি ক্ষমতাসম্পন্ন পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের বদলে ১২০০ জিপিডি'র একটি ইউনিট সরবরাহ করা হয়েছে, যা এখনো স্থাপন করা হয়নি, এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার অপচয় হয়েছে। একইভাবে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অভিযান চালায়। ২৪ কোটি টাকার ওষুধ কেনাকাটায় প্রায় ৪ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে হাসপাতালের পরিচালক ও বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। এই ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। এসব ঘটনা স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়, যারা সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এই দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অপ্রয়োজনীয় বা নিম্নমানের সরঞ্জাম ক্রয়, অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এবং ওষুধের কালোবাজারি সাধারণ মানুষকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির মহোৎসবের কথা উল্লেখ করে সুশাসনের ঘাটতি তুলে ধরেছিল। এমনকি, বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে, যা মোট সরকারি ব্যয়ের মাত্র ১.১ শতাংশ। অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদের গবেষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতের মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই অপচয় বা দুর্নীতির কারণে জনগণের সেবায় কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা তৈরি করছে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, ক্রয় প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) কঠোরভাবে অনুসরণ করা এবং ই-জিপি (e-GP) পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি ক্রয় কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ এবং নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্রয়কৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চিহ্নিত করে সেগুলোর সদ্ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর চলমান তদন্ত কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে হবে এবং চিহ্নিত সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ধরাছোঁয়ার বাইরে না থাকে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এবং একটি 'জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন' ও 'জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল' গঠন বিবেচনা করা যেতে পারে। পঞ্চমত, হাসপাতালগুলোতে সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন, ওষুধের স্টক তালিকা প্রকাশ এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সহজ করতে হবে।

📎 এই প্রতিবেদনের তথ্যপ্রমাণ

গুগল সার্চের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের গবেষণায় ব্যবহৃত প্রকৃত সোর্স:


🔎 অনুসন্ধানে: রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator