সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দেশের শহরাঞ্চলে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৪৫% নিয়মিতভাবে কোনো না কোনো ডিজিটাল ফিটনেস অ্যাপ ব্যবহার করছেন। এই হার গত পাঁচ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে ঘরে বসে স্বাস্থ্যচর্চার প্রবণতা বাড়ার সাথে সাথে MyFitnessPal, Google Fit, Apple Health-এর মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তৈরি কিছু অ্যাপেরও ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অভ্যাসেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি জনস্বাস্থ্য নীতি এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পদ্ধতিতেও নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। এই ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল নির্ভরতা একদিকে যেমন সুস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক সমীকরণ তৈরি করছে, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ডেটা সুরক্ষা, ডিজিটাল বৈষম্য এবং তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
এই ডিজিটাল বিপ্লব শুধু ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেই থামেনি, বরং ফিটনেস অ্যাপগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) ব্যবহার করে ব্যক্তিগতকৃত স্বাস্থ্য পরিকল্পনা, ঘুম পর্যবেক্ষণ, ক্যালরি ট্র্যাকিং এবং এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও নজর রাখছে। World Bank-এর 'Digital Health Bangladesh' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে ডিজিটাল স্বাস্থ্য সরঞ্জামগুলো স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই সহজলভ্যতা ব্যবহারের খরচ এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের সক্ষমতার উপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, প্রিমিয়াম ফিটনেস অ্যাপগুলির সাবস্ক্রিপশন ফি অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ব্যবহারকারীর জন্য একটি বাধা হতে পারে। উপরন্তু, এই অ্যাপগুলি থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ডেটার সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ডেটা এনক্রিপশন, ব্যবহারকারীর সম্মতি এবং ডেটা ব্যবহারের নীতিমালার স্বচ্ছতা অপরিহার্য, কারণ সংবেদনশীল স্বাস্থ্য ডেটা অপব্যবহারের শিকার হলে তা মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। বর্তমানে, বাংলাদেশে ডিজিটাল ডেটা সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও, স্বাস্থ্য ডেটার বিশেষ সুরক্ষার জন্য আরও বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রয়োজন, যা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হতে পারে।
ডিজিটাল ফিটনেস অ্যাপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনের পাশাপাশি এটি একটি নতুন ধরনের ডিজিটাল বৈষম্যও তৈরি করছে। ADB (Asian Development Bank)-এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা শহরাঞ্চলের তুলনায় কম হওয়ায়, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুফল থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সূচকে এক নতুন ধরনের বৈষম্য দেখা দিতে পারে, যেখানে শহুরে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে আরও স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠছেন, আর গ্রামীণ জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ছেন। শুধু ইন্টারনেট সংযোগই নয়, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবও এই বৈষম্যের একটি কারণ। অনেক অ্যাপ ব্যবহারকারী তাদের ডেটা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে বা অ্যাপের পরামর্শ কতটা বিজ্ঞানসম্মত, তা সম্পর্কে অবগত নন। এর ফলে ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যচর্চা বা চিকিৎসার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার যদি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল স্বাস্থ্য কাঠামো তৈরি করতে চায়, তবে শুধু অ্যাপের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করলেই হবে না, বরং ডিজিটাল স্বাস্থ্য সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত হবে বিজ্ঞানসম্মত এবং নির্ভরযোগ্য অ্যাপগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, যাতে ব্যবহারকারীরা ভুল তথ্য বা অনির্ভরযোগ্য অ্যাপের শিকার না হন।
| ফিটনেস অ্যাপ ব্যবহারকারীর ধরন | ২০১৭ (% ব্যবহারকারী) | ২০২২ (% ব্যবহারকারী) | ২০২৭ (প্রক্ষেপিত % ব্যবহারকারী) |
|---|---|---|---|
| নিয়মিত ব্যবহারকারী (সপ্তাহে ৩+ দিন) | ১০% | ৩০% | ৫০% |
| অনিয়মিত ব্যবহারকারী (সপ্তাহে ১-২ দিন) | ১৫% | ১৫% | ১০% |
| কদাচিৎ ব্যবহারকারী (মাসে ১-২ বার) | ২০% | ১০% | ৫% |
| মোট ডিজিটাল ফিটনেস অ্যাপ ব্যবহারকারী | ৪৫% | ৫৫% | ৬৫% |
উৎস: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ (২০২২); World Bank ও ADB-এর যৌথ সমীক্ষা (২০২৩)।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে 'ডিজিটাল স্বাস্থ্য ডেটা সুরক্ষা নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের GDPR এবং HIPAA-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ডেটার সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করবে।
- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) কে যৌথভাবে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরকে ডিজিটাল স্বাস্থ্য সাক্ষরতা কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী কর্মশালা ও প্রচারণার আয়োজন করতে হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের জন্য।
- জাতীয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC) কে যৌথভাবে ডিজিটাল ফিটনেস ও স্বাস্থ্য অ্যাপগুলোর কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা মূল্যায়নের জন্য একটি মান নির্ধারণ কমিটি গঠন করতে হবে, যা বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের ভিত্তিতে অ্যাপগুলোর অনুমোদন ও তদারকি করবে, এবং জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনুমোদিত অ্যাপের একটি তালিকা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে।