শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র

মহিউদ্দিন নবী  avatar   
মহিউদ্দিন নবী
শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র
শিক্ষা খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত, যা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল ভিত্তি, বর্তমানে এক গভীর দুর্নীতি ও অনিয়মের জালে আবদ্ধ। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে এমপিওভুক্তি (Monthly P...

বাংলাদেশের শিক্ষা খাত, যা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল ভিত্তি, বর্তমানে এক গভীর দুর্নীতি ও অনিয়মের জালে আবদ্ধ। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে এমপিওভুক্তি (Monthly Pay Order) এবং বদলি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই চলছে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ বাণিজ্য। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দুর্নীতির শিকড় এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, এটি এখন যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ঘটনাপ্রবাহ এই ভয়াবহ চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রায় ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে, যা এই খাতের ভঙ্গুর দশার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহল আশঙ্কা করছে যে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জাল সনদের পুরোনো চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে। অতীতে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল, যার ফলস্বরূপ ২০১৫ সাল থেকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কে নিয়োগের সুপারিশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তবে এনটিআরসিএ পদ্ধতিতেও কিছু কাঠামোগত সমস্যা, যেমন দূরবর্তী কর্মস্থলে পদায়ন ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা রয়ে গেছে। সম্প্রতি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, যেখানে ১৩ জন প্রার্থীকে অনিয়ম ও প্রতারণার মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও, শেরপুরের জমসেদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি, শিক্ষকদের চাকরি পেতে ১৫-২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এমপিওভুক্তি এবং অন্যান্য আর্থিক অনিয়মও শিক্ষা খাতের দুর্নীতির একটি বড় অংশ। নোয়াখালীর লাউতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঁচ শিক্ষককে এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি তার স্ত্রীকে জালিয়াতির মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দেন এবং মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর জাল করেন। মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরাও এমপিও বাণিজ্য এবং নানা অনিয়ম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন, যেখানে এমপিও আবেদনের জন্য অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। একটি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে মার্চ ২০২৫ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে শিক্ষা বিভাগের ৮৬ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এই চক্র নথি আটকে রেখে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় এবং অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ফাইল নিষ্পত্তির সময় বাড়ানো-কমানো হয়। ডিআইএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের শেষ ছয় মাসে (১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫) ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, ১৭৬ একর সরকারি জমি বেহাত এবং জাল সনদে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্টকে ৫ হাজারের বেশি সার্টিফিকেট ও মার্কশিট বাণিজ্যের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা জাল সনদের ব্যাপকতার প্রমাণ।

শিক্ষক বদলি ও পদোন্নতিতেও চলছে রমরমা বাণিজ্য। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) কেন্দ্র করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রে অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্থতাকারীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো বদলি বাণিজ্য চলবে না এবং কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম অ্যাপভিত্তিক করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতিতে ঘুষের অজুহাতে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৫ জন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক বদলি করা হয়েছে। এসব অনিয়মের পাশাপাশি, আইনি জটিলতার কারণে প্রায় ৮৭ হাজার শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি আটকে আছে, যা শিক্ষক সংকট নিরসনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুপারিশ: শিক্ষা খাতের এই গভীর সংকট নিরসনে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাতিল করে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিকায়ন করতে হবে। এনটিআরসিএ-এর বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা, যেমন দূরবর্তী পদায়ন ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা দূর করার জন্য দ্রুত বদলি নীতিমালা প্রণয়ন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এমপিওভুক্তি, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সকল প্রকার আর্থিক লেনদেন ও অনিয়ম বন্ধে কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনিয়মে জড়াতে সাহস না পায়। তৃতীয়ত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সুপারিশগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে আর্থিক অনিয়ম, জাল সনদ এবং সরকারি জমি বেহাতের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষা প্রশাসনের সকল কার্যক্রমকে অ্যাপভিত্তিক ও ডিজিটাল করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দালালচক্রের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়। পরিশেষে, শিক্ষা খাতে চলমান আইনি জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে আটকে থাকা নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, যাতে যোগ্য শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন।


🔎 অনুসন্ধানে: মহিউদ্দিন নবী

মহিউদ্দিন নবী, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্য।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator