বঙ্গোপসাগর: ভূ-রাজনৈতিক দাবার নতুন চাল | আই নিউজ বিডি

বঙ্গোপসাগর: ভূ-রাজনৈতিক দাবার নতুন চাল

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
বঙ্গোপসাগর: ভূ-রাজনৈতিক দাবার নতুন চাল
বঙ্গোপসাগর: ভূ-রাজনৈতিক দাবার নতুন চাল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত 'বে অব বেঙ্গল ইকোনমিক ফোরাম'-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ডোনাল্ড লু-এর উপস্...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত 'বে অব বেঙ্গল ইকোনমিক ফোরাম'-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ডোনাল্ড লু-এর উপস্থিতি এবং তার বক্তব্যে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ফোরামে লু বঙ্গোপসাগরকে 'ইন্দো-প্যাসিফিকের হৃদয়' হিসেবে আখ্যায়িত করে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা চীন ও ভারতের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার আবহে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বঙ্গোপসাগর বহু শতাব্দী ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বর্তমানে, এর কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে কারণ বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি কন্টেইনার বাণিজ্য এবং তেল পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। মালয়েশিয়ার মালাক্কা প্রণালী থেকে শুরু করে আন্দামান সাগর পেরিয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই সামুদ্রিক করিডোরটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের 'সাগর' (Security and Growth for All in the Region) নীতি এবং চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'-এর অধীনে বন্দর উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পগুলো যেমন বাংলাদেশের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা এবং মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর বঙ্গোপসাগরের উপকূলে তাদের ভূ-রাজনৈতিক পদচিহ্নকে আরও স্পষ্ট করেছে। এই প্রকল্পগুলি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয় না, বরং সামরিক কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকেও প্রতিটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল সম্পদের অনাবিষ্কৃত ভাণ্ডার এবং মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যার ফলে উপকূলীয় দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং যৌথ সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে উঠেছে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা কেবল উপকূলীয় দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের উপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিমসটেক (BIMSTEC) এর মতো সংস্থা, যা বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল এবং ভুটানকে একত্রিত করে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবংconnectivity বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। তবে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা এই সংস্থার কার্যকারিতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে, সার্ক (SAARC) তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সীমিত ভূমিকা পালন করতে পারছে। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক দেশগুলো প্রায়শই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার দিকে ঝুঁকছে, যা একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগ ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অন্যদিকে আঞ্চলিক জোটগুলোকে দুর্বল করে তুলছে এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পথকে জটিল করে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট এবং বঙ্গোপসাগরে তাদের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায় যেমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তেমনি এই ধরনের সংকট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্রমাগত হুমকি তৈরি করে।

সংস্থা/উদ্যোগ সদস্য সংখ্যা প্রতিষ্ঠার সাল বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক প্রধান কার্যক্রম/লক্ষ্য ২০২২ সালের বাজেট (আনুমানিক)
BIMSTEC ৭ ১৯৯৭ আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ,connectivity, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমন $১.৫ মিলিয়ন (সচিবালয়)
SAARC ৮ ১৯৮৫ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা $২.৫ মিলিয়ন (সচিবালয়)
UN Peacekeeping (বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে) ১৫৩টি দেশ থেকে সদস্য ১৯৪৮ সংঘাত নিরসন, শান্তি স্থাপন ও মানবাধিকার রক্ষা $৬.৮ বিলিয়ন (বিশ্বব্যাপী)
ভারতের 'সাগর' নীতি - ২০১৫ আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও মেরিটাইম ডোমেইন সচেতনতা অর্থায়ন নির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করা হয় না, তবে প্রতিরক্ষা ও উন্নয়ন বাজেটের অংশ

উৎস: BIMSTEC Secretariat, SAARC Secretariat, United Nations Department of Peace Operations, Indian Ministry of External Affairs Annual Reports.

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিমসটেক (BIMSTEC) এর কাঠামোতে একটি 'মেরিটাইম সিকিউরিটি ডায়ালগ' প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিতে হবে, যেখানে সদস্য দেশগুলোর নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের মধ্যে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ মহড়ার আয়োজন করা হবে, যা বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সহায়ক হবে।
  • আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য 'জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন (UNCLOS)' এর ধারাগুলো মেনে একটি আঞ্চলিক 'ব্লু ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি ও বাস্তবায়নের জন্য সার্ক (SAARC) এর প্ল্যাটফর্মটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যেখানে মৎস্য সম্পদ, সামুদ্রিক খনিজ ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যৌথ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ থাকবে।
  • UN Peacekeeping এর অভিজ্ঞতার আলোকে, বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তার জন্য একটি আঞ্চলিক 'দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া টাস্কফোর্স' গঠন করতে হবে, যার জন্য প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট সম্পদ ও জনবল বরাদ্দ করতে হবে এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator