জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার নৈতিক সংকট | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার নৈতিক সংকট

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার নৈতিক সংকট
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার নৈতিক সংকট
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর ভেটো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সুরক্ষার মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা সাম্প্রতিক গাজা উপত্যকায় চলমান...

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর ভেটো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সুরক্ষার মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা সাম্প্রতিক গাজা উপত্যকায় চলমান মানবিক সংকট নিরসনে বারবার প্রস্তাব পাসে বাধার সম্মুখীন হওয়ার ঘটনায় প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। গত ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো সত্ত্বেও, নিরাপত্তা পরিষদে অন্তত চারবার প্রস্তাবনায় ভেটো প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকের জীবন বিপন্ন হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ভার এড়ানো সহজ হয়েছে। এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের কার্যকারিতা এবং এর নৈতিক অবস্থানের ওপর গভীর ছায়া ফেলেছে, যা এর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যকে বিদ্রূপ করছে।

নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা, যা ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের সনদ প্রণয়নের সময় 'পঞ্চম বৃহৎ শক্তি' (P5) – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং চীনকে দেওয়া হয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বৃহৎ শক্তিগুলোর ঐকমত্য নিশ্চিত করা। ধারণা করা হয়েছিল যে, এই দেশগুলোর সম্মতি ব্যতীত কোনো বড় সামরিক পদক্ষেপ সফল হবে না এবং ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে অযৌক্তিক বা বিপজ্জনক সামরিক হস্তক্ষেপ রোধ করা যাবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই ক্ষমতা প্রায়শই জাতীয় ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে আসছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে সিরিয়া, ইউক্রেন বা ফিলিস্তিনের মতো সংঘাতে, ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার বৈশ্বিক সংকট সমাধানে জাতিসংঘের ভূমিকাকে পঙ্গু করে দিয়েছে, যেখানে একটি মাত্র দেশের স্বার্থ কোটি কোটি মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ভেটো ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষুণ্ন করছে এবং জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যখন একটি দেশ তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সম্ভাব্য তদন্ত বা প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ আটকে দেয়, তখন আন্তর্জাতিক বিচার এবং জবাবদিহিতার ধারণাটি প্রহসনে পরিণত হয়। এটি জাতিসংঘের 'দায়িত্ব রক্ষা' (Responsibility to Protect - R2P) নীতিকেও অকার্যকর করে তোলে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূলকরণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে তাদের নিজ নিজ জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেয়। যখন P5 দেশগুলো ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ আটকে দেয়, তখন এটি কেবল সংঘাতকেই দীর্ঘায়িত করে না, বরং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এবং এর প্রয়োগযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থা যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) তাদের কার্যকারিতা প্রদর্শনে বাধার সম্মুখীন হয়, কারণ ভেটো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ আটকে দেয়।

এই ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে, যারা বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের দাবি জানাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation) এর মতো প্ল্যাটফর্মে বারবার নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই দেশগুলো যুক্তি দেয় যে, বর্তমান কাঠামোটি ১৯৪৫ সালের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে, যা একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। UN Peacekeeping মিশনগুলো প্রায়শই ভেটো ক্ষমতার কারণে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, সৈন্য বা ম্যান্ডেট পেতে ব্যর্থ হয়, যা তাদের কার্যকারিতা হ্রাস করে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদানকে সীমিত করে। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগের কারণে অসংখ্য শান্তি মিশন প্রস্তাবিত বাধার সম্মুখীন হয়েছে, যা তাদের নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

সময়কাল মোট ভেটো P5 দেশগুলোর ভেটো প্রয়োগ (শীর্ষ ৩) উল্লেখযোগ্য প্রভাব
১৯৪৬-১৯৬৫ ১১২ সোভিয়েত ইউনিয়ন: ১০৩, ফ্রান্স: ৫, যুক্তরাজ্য: ৪ স্নায়ুযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে পশ্চিমা প্রস্তাব আটকে রাখা।
১৯৬৬-১৯৮৫ ১১২ সোভিয়েত ইউনিয়ন: ৩০, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ৪২, যুক্তরাজ্য: ২৩ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী প্রস্তাবে মার্কিন ভেটো।
১৯৮৬-২০০৫ ৪৯ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ৩৫, চীন: ৮, রাশিয়া: ৬ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সংক্রান্ত প্রস্তাবে মার্কিন ভেটো।
২০০৬-২০২৩ ৫৩ রাশিয়া: ২৮, চীন: ১৪, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ৭ সিরিয়া ও ইউক্রেন সংঘাত সংক্রান্ত প্রস্তাবে রাশিয়া-চীনের ভেটো, ফিলিস্তিন প্রশ্নে মার্কিন ভেটো।

উৎস: UN Security Council Veto List (UNSC) এবং Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI) এর সংগৃহীত তথ্য।

সুপারিশ

  • জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UN General Assembly) দ্বারা 'ভেটো ইনিশিয়েটিভ' (Veto Initiative) প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক করা হোক, যেখানে নিরাপত্তা পরিষদের কোনো স্থায়ী সদস্য ভেটো প্রয়োগ করলে, সাধারণ পরিষদকে অবশ্যই ৩০ দিনের মধ্যে একটি বিতর্ক আয়োজন করতে হবে এবং ভেটো প্রয়োগের যৌক্তিকতা জনসম্মুখে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করা হবে।
  • নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদে নতুন দেশ অন্তর্ভুক্তির জন্য জাতিসংঘের সনদ (UN Charter) এর ২৩ ও ২৭ অনুচ্ছেদের সংস্কার করা হোক, যেখানে আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে ভারত, জার্মানি, জাপান, ব্রাজিল এবং আফ্রিকান ইউনিয়নকে স্থায়ী সদস্যপদ প্রদান করা যেতে পারে, যা ভেটো ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহারকে সীমিত করবে।
  • আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (International Court of Justice - ICJ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court - ICC) এর এখতিয়ারকে আরও শক্তিশালী করা হোক, যাতে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো সত্ত্বেও গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত দেশ বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়; এর জন্য ICC-এর রোম সংবিধি (Rome Statute) এবং ICJ-এর সংবিধিতে (Statute of the International Court of Justice) প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা জরুরি।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator