নির্মাণ খাতে ইস্পাত ও সিমেন্টের গুণগত মান: সুদূরপ্রসারী চ্যালেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রণের ফাঁক | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নির্মাণ খাতে ইস্পাত ও সিমেন্টের গুণগত মান: সুদূরপ্রসারী চ্যালেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রণের ফাঁক

আলতাফ হোসেন  avatar   
আলতাফ হোসেন
নির্মাণ খাতে ইস্পাত ও সিমেন্টের গুণগত মান: সুদূরপ্রসারী চ্যালেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রণের ফাঁক
নির্মাণ খাতে ইস্পাত ও সিমেন্টের গুণগত মান: সুদূরপ্রসারী চ্যালেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রণের ফাঁক
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত ইস্পাত ও সিমেন্টের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে নিম্ন...

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত ইস্পাত ও সিমেন্টের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রীর কারণে প্রতি বছর অবকাঠামোতে প্রায় ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এই প্রতিবেদনে বিশেষ করে বেসরকারি আবাসন এবং কিছু ছোট সরকারি প্রকল্পে ব্যবহৃত উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৯-২০২১ সালের মধ্যে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারের প্রায় ১৫% ইস্পাত রড এবং ১০% সিমেন্ট নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা কেবল কাঠামোর স্থায়িত্বই নয়, বরং জননিরাপত্তাকেও মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বাসযোগ্যতার উপরও প্রশ্ন তুলছে।

এই গুরুতর সমস্যাটি শুধুমাত্র স্থানীয় সরবরাহকারীদের অনিয়ম বা অসততার ফল নয়, বরং এর মূলে রয়েছে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং মান পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ার অভাব। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ইস্পাত ও সিমেন্ট পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করলেও, এর প্রয়োগ ও পরিবীক্ষণে বহু ফাঁক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার পরিধি অত্যন্ত সীমিত, এবং উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধার অভাব প্রকট। বিশেষ করে, ছোট ও মাঝারি আকারের ইস্পাত রি-রোলিং মিল এবং সিমেন্ট কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না, যা সরাসরি পণ্যের গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। অনেক ক্ষেত্রে, কাঁচামাল আমদানির সময়ও গুণগত মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি শিথিল থাকে, যা চূড়ান্ত পণ্যে নিম্নমানের উপাদান প্রবেশের পথ খুলে দেয়। এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের 'বাংলাদেশ: আরবান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম'-এর আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পে গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষার সুপারিশ করলেও, সকল ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে।

এই নিয়ন্ত্রণের ফাঁকগুলি কেবল গুণগত মানকেই প্রভাবিত করে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের উপরও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিম্নমানের ইস্পাত ও সিমেন্ট ব্যবহার করে নির্মিত অবকাঠামো যেমন সড়ক, সেতু, এবং ভবনগুলির আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, যার ফলে ঘন ঘন মেরামত ও পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হয়। এটি একদিকে যেমন সরকারের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপায়, তেমনি অন্যদিকে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা কঠিন করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন অনেক প্রকল্পেই নির্মাণ সামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা পরবর্তীতে মেরামতের জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের দাবি তুলেছে। বাংলাদেশ সরকার যদিও 'রূপকল্প ২০৪১' বাস্তবায়নে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে, তবে এই বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে হলে নির্মাণ সামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই সমস্যা মোকাবেলায়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও একটি বড় বাধা, যা একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত নীতি প্রণয়নে বিলম্ব ঘটাচ্ছে।

নির্মাণ সামগ্রী ২০১৯ সালে মান লঙ্ঘনের হার (%) ২০২১ সালে মান লঙ্ঘনের হার (%) ২০২৩ সালে মান লঙ্ঘনের হার (%)
ইস্পাত রড (৬০ গ্রেড) ১২.৫% ১৪.৮% ১৫.৩%
প্লাস্টার সিমেন্ট (পিওআরটি) ৮.৯% ১০.২% ১১.১%
কাঠামোগত সিমেন্ট (ওপিসি) ৫.১% ৬.৩% ৬.৯%

উৎস: বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন, 'বাংলাদেশ কন্সট্রাকশন ম্যাটেরিয়ালস কোয়ালিটি অ্যাসেসমেন্ট, ২০২৩'

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর জনবল ও পরীক্ষাগার সুবিধা আধুনিকীকরণ এবং ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবিলম্বে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে ইস্পাত ও সিমেন্টের উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি স্তরে বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত মান নিরীক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
  • গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহৃত ইস্পাত ও সিমেন্টের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য একটি কঠোর 'তৃতীয় পক্ষ মান যাচাইকরণ নীতি' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি বৃহৎ ও মাঝারি প্রকল্পে স্বাধীন পরীক্ষাগার দ্বারা নিয়মিত পরীক্ষার ফলাফল বাধ্যতামূলকভাবে দাখিল করতে হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পে মানসম্পন্ন কাঁচামাল আমদানি এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য একটি বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে, যা 'শিল্পনীতি ২০১৬'-এর আলোকে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনে সহায়ক হবে এবং নিম্নমানের কাঁচামাল আমদানির উপর উচ্চ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আলতাফ হোসেন

আলতাফ হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভারী শিল্প, ইস্পাত ও সিমেন্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator