জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারের পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারের পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারের পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারের পথে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে পরিবেশবান্ধব পু...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেলেও, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করে, বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গাইডলাইনসের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এর পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।

বাংলাদেশের উপকূল রেখা বরাবর গড়ে ওঠা সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প দেশের ইস্পাত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল যোগানদাতা হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পের প্রায় ৬০-৭০% কাঁচামাল এই শিল্প থেকে আসে, যা দেশের নির্মাণ খাত ও অবকাঠামো উন্নয়নে অপরিহার্য। তবে, এই শিল্পে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো প্রায়শই পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করে। পুরনো জাহাজ থেকে অ্যাসবেস্টস, পলichlorinated বাইফিনাইল (PCBs), ভারী ধাতু এবং তেল জাতীয় বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশে মিশে জলজ বাস্তুতন্ত্র ও উপকূলীয় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য আধুনিক প্রযুক্তির অভাব প্রকট। এই সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার ‘জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮’ প্রণয়ন করেছে, যার লক্ষ্য হলো এই শিল্পকে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ করা। কিন্তু, আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (IMO) কর্তৃক গৃহীত হংকং কনভেনশনের মান পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার কারণে শ্রমিকরা প্রায়শই মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন, যার মধ্যে আগুন লাগা, বিস্ফোরণ, এবং বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা অন্যতম। গত এক দশকে, এই শিল্পে শত শত শ্রমিকের মৃত্যু এবং হাজার হাজার শ্রমিকের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যদিও শ্রম মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ব্যবহারের উপর জোর দিয়েছে, মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ এখনও অসন্তোষজনক। অনেক ইয়ার্ডে এখনও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা এবং আধুনিক অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায়, বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করছে, যার মধ্যে World Bank এর অর্থায়নে পরিচালিত কিছু প্রকল্পও রয়েছে, যা নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া উন্নয়নে সহায়তা করছে। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ইয়ার্ডগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং শ্রমিকদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তবে এর গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং পরিবেশ ও শ্রমিকের সুরক্ষার উপরও নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এর মতো কিছু দেশ পরিবেশগত মান পূরণে ব্যর্থ ইয়ার্ড থেকে জাহাজ ভাঙার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়, বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করতে হবে যাতে প্রতিটি ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুসংহত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর পাশাপাশি, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
ভাঙা জাহাজের সংখ্যা (ইউনিট) ২২৬ ২৪১ ১৫৪ ২২০ ২১০
মোট পুনর্ব্যবহারকৃত ইস্পাত (টন) ২.২ মিলিয়ন ২.৫ মিলিয়ন ১.৬ মিলিয়ন ২.৩ মিলিয়ন ২.১ মিলিয়ন
পরিবেশবান্ধব ইয়ার্ডের সংখ্যা (হংকং কনভেনশন অনুসারী) ২ ৪ ৭ ৯ ১২
শ্রমিক দুর্ঘটনা (প্রতি ১০০০০ শ্রমিক) ৪৭ ৪২ ৩০ ২৮ ২৫
বর্জ্য পৃথকীকরণ হার (শতাংশ) ১৫% ২০% ২৫% ৩০% ৩৫%

উৎস: বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSBRA), পরিবেশ অধিদপ্তর ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে ‘জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮’ এর কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে বিষাক্ত বর্জ্য (যেমন অ্যাসবেস্টস, PCB) নিরাপদ নিষ্পত্তি এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার প্রয়োগে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
  • শ্রম মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর গাইডলাইনস অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক উচ্চমানের প্রশিক্ষণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ইয়ার্ডে নিয়মিত সুরক্ষা অডিট পরিচালনা এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ‘শ্রম আইন, ২০০৬’ ও ‘শ্রম বিধিমালা, ২০১৫’ এর অধীনে কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, World Bank এবং ADB এর সহায়তায়, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠন এবং ইয়ার্ডগুলোকে হংকং কনভেনশন মেনে চলার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে। এর মধ্যে আধুনিক ক্রেন, বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট এবং নিরাপদ ব্রেকিং স্লিপওয়ে নির্মাণে ভর্তুকি বা সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator