নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: ব্যবধান ঘোচাতে ডিজিটাল জবাবদিহিতা | আই নিউজ বিডি

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: ব্যবধান ঘোচাতে ডিজিটাল জবাবদিহিতা

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: ব্যবধান ঘোচাতে ডিজিটাল জবাবদিহিতা
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: ব্যবধান ঘোচাতে ডিজিটাল জবাবদিহিতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে প্রদত্ত শীর্ষ ৫০টি প্রতিশ্রুতি...

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে প্রদত্ত শীর্ষ ৫০টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রায় ৪০% প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, যা জনআস্থা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি ভোটারদের মধ্যে দানা বাঁধা হতাশা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতার প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই ডিজিটাল মাধ্যমকেই জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারাটা এক বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যখন সরকারগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নাগরিক পরিষেবা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে, তখন বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি জনআস্থায় ফাটল ধরাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রায়শই রাজনৈতিক দলগুলোর একটি কর্মপরিকল্পনা হিসেবে দেখা হয়, যা নির্বাচিত হলে তারা বাস্তবায়ন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই ইশতেহারগুলো কেবল নির্বাচনের সময় ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, যার বাস্তবায়ন পরবর্তীকালে আর সেভাবে অনুসরণ করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'স্ট্রেংদেনিং পাবলিক ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট' (SPFMS) প্রকল্পের আওতায় ডিজিটাল বাজেট ট্র্যাকিং ও অডিট সিস্টেম বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে, যা সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। কিন্তু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে এই ধরনের সমন্বিত ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা এখনও অনুপস্থিত। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'গভর্নেন্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন অ্যাকশন প্ল্যান' (GCAP) এর আওতায় বিভিন্ন সদস্য দেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিলেও, বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ট্র্যাক করার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও কার্যকর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভাব প্রকট। এই অভাবের কারণে নাগরিকরা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য পায় না, যা তাদের মধ্যে অংশগ্রহণের আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা তৈরি করে। প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং সে সম্পর্কিত তথ্য জনগণের কাছে সহজলভ্য না হওয়ায়, জবাবদিহিতা কেবল একটি মৌখিক শব্দে পরিণত হচ্ছে, যার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।

ডিজিটাল জবাবদিহিতা কেবল প্রতিশ্রুতি পূরণের তথ্য প্রকাশ করা নয়, বরং এটি একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া যেখানে নাগরিকরা তাদের মতামত দিতে পারে, প্রশ্ন তুলতে পারে এবং অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারে। বর্তমানে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (বিইসি) নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিভিন্ন তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করলেও, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি ট্র্যাক করার জন্য একটি সমন্বিত ও সর্বজনীন প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলেও, এটি নির্বাচনী ইশতেহারের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে একটি বিচ্ছিন্ন চিত্র উপস্থাপন করে। ফলস্বরূপ, একজন সাধারণ ভোটারকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের ওয়েবসাইট ঘেঁটে ইশতেহারের একটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল। এই অগোছালো তথ্য ব্যবস্থার কারণে, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে, তার জন্য নির্দিষ্টভাবে কে দায়ী, তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিক অভিযোগ বা মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেও, সেগুলোর প্রতিক্রিয়া বা সমাধান প্রক্রিয়া প্রায়শই অস্বচ্ছ থাকে, যা ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থাকে আরও ক্ষুণ্ণ করে। একটি কার্যকর ডিজিটাল জবাবদিহিতা কাঠামো নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যা বর্তমানে বাংলাদেশে অনুপস্থিত।

প্রতিশ্রুতির ধরন ২০১৪ সালের ইশতেহারে (%) ২০১৮ সালের ইশতেহারে (%) বাস্তবায়িত (গড় %) অবাস্তবায়িত/আংশিক বাস্তবায়িত (গড় %)
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ২৫% ৩০% ৫৫% ৪৫%
সুশাসন ও দুর্নীতি দমন ২০% ১৫% ৩০% ৭০%
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ৩০% ২৫% ৭০% ৩০%
অবকাঠামো উন্নয়ন ১৫% ২০% ৮৫% ১৫%
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ১০% ১০% ৪০% ৬০%

উৎস: টিআইবি প্রতিবেদন (২০২৩), বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদন ও বিশ্বব্যাংকের ডেটা থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (বিইসি) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি বিভাগ) এর যৌথ উদ্যোগে একটি কেন্দ্রীয় 'নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ট্র্যাকিং পোর্টাল' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতির জন্য নির্দিষ্ট সূচক (KPI) নির্ধারণ করে নিয়মিত অগ্রগতি আপডেট করা হবে। এই পোর্টালে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি বাধ্যতামূলক তথ্য আপলোডিং নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, 'নাগরিক অধিকার আইন, ২০০৯' এর আওতায় একটি ডিজিটাল অভিযোগ নিষ্পত্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সম্পর্কিত নাগরিক অভিযোগ সরাসরি গ্রহণ করবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া ও সমাধানের অগ্রগতি প্রকাশ করতে বাধ্য থাকবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা জনপ্রতিনিধির পারফরম্যান্স মূল্যায়নের একটি প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে।
  • অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বাজেট বরাদ্দের সাথে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির সংযোগ স্থাপন করে একটি 'ইশতেহার-ভিত্তিক বাজেট ট্র্যাকিং সিস্টেম' চালু করবে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি-র সহায়তায় পরিচালিত পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট রিফর্মস (PFMR) প্রোগ্রামের অধীনে বিদ্যমান ডিজিটাল সিস্টেমগুলোকে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, কোন প্রতিশ্রুতির জন্য কত অর্থ বরাদ্দ হয়েছে এবং তার ব্যয় কতটুকু হয়েছে, তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator