নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য হোস্টেল সুবিধা: স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি না উপেক্ষিত দাবি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য হোস্টেল সুবিধা: স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি না উপেক্ষিত দাবি?

রেহানা আক্তার  avatar   
রেহানা আক্তার
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য হোস্টেল সুবিধা: স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি না উপেক্ষিত দাবি?
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য হোস্টেল সুবিধা: স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি না উপেক্ষিত দাবি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেশের বিভিন্ন জেলায় নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষায়িত হোস্টেল নির্মাণের একটি পাইলট প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা প্...

সম্প্রতি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক দেশের বিভিন্ন জেলায় নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষায়িত হোস্টেল নির্মাণের একটি পাইলট প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ নারী ক্রীড়াঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রথম ধাপে পাঁচটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হোস্টেল তৈরির প্রস্তাবনা রয়েছে, যা দীর্ঘদিনের একটি উপেক্ষিত দাবিকে সামনে এনেছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ ও সাফল্য বৃদ্ধি পেলেও, তাদের জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আবাসন সুবিধা প্রায়শই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। বিশেষ করে মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে হোস্টেল সুবিধার বিকল্প নেই। এই প্রেক্ষাপটে, মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ একদিকে যেমন স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি হতে পারে, তেমনই কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে এটি উপেক্ষিত দাবির তালিকায়ও থেকে যেতে পারে।

বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষায়িত আবাসন সুবিধা বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ অবহেলিত ক্ষেত্র। দেশের জাতীয় দলগুলোতে নারী ফুটবলার, ক্রিকেটার, আর্চার, শুটারদের ঈর্ষণীয় সাফল্য সত্ত্বেও, তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির জন্য অত্যাবশ্যকীয় আবাসিক সুবিধা অপ্রতুল। World Bank-এর 'Sports Development for Gender Equality' শীর্ষক ২০১৯ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নারী ক্রীড়াবিদদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান বাধা হলো নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের অভাব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই চিত্র ব্যতিক্রম নয়। বিশেষত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যেখানে প্রতিভা অন্বেষণ করা হয়, সেখানে উপযুক্ত হোস্টেল না থাকায় অনেক সম্ভাবনাময়ী খেলোয়াড়কে তাদের পরিবার খেলাধুলায় পাঠাতে দ্বিধা করে। বিদ্যমান হাতেগোনা কিছু হোস্টেলও প্রায়শই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, পুষ্টিসম্মত খাদ্যের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে ভুগছে। এর ফলে খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা তাদের ক্রীড়া নৈপুণ্যকেও ব্যাহত করে। শুধু আবাসিক সুবিধাই নয়, এসব হোস্টেলে আধুনিক জিমনেসিয়াম, চিকিৎসা সুবিধা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক, যা একজন ক্রীড়াবিদের সার্বিক বিকাশে অপরিহার্য।

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য হোস্টেল সুবিধার বিষয়টি কেবল আবাসন সংকট নিরসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। Asian Development Bank (ADB)-এর 'Empowering Women Through Sports: A Regional Perspective' নামক সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেখানে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে তাদের পেশাদার ক্রীড়াজীবনে যুক্ত হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, অনেক নারী খেলোয়াড় তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। খেলাধুলার মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদেরই নয়, পরিবারেরও আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছেন। কিন্তু সুষ্ঠু আবাসন ও প্রশিক্ষণের অভাবে তাদের ক্যারিয়ার থমকে গেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন ক্রীড়া বৃত্তি এবং পুরস্কারের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তা করা হলেও, সেই সহায়তার পূর্ণাঙ্গ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি স্থিতিশীল ও সহায়ক আবাসিক পরিবেশ অপরিহার্য। বিশেষ করে, গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আসা তরুণী ক্রীড়াবিদদের জন্য নিরাপদ এবং সুরক্ষিত হোস্টেলই তাদের স্বপ্ন পূরণের একমাত্র অবলম্বন হতে পারে, যেখানে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্নভাবে খেলাধুলায় মনোযোগ দিতে পারবে। এই সুযোগ ব্যাহত হলে দীর্ঘমেয়াদে নারী ক্রীড়াবিদদের সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য একটি বড় ক্ষতি।

প্রতিষ্ঠান/প্রকল্প বছর নারী ক্রীড়াবিদ হোস্টেল সুবিধা সম্পর্কিত বরাদ্দ (কোটি টাকা) প্রস্তাবিত/নির্মিত হোস্টেলের সংখ্যা অবস্থা
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ) ২০১৪-২০১৮ ৫.৫ ২ আংশিক নির্মিত, সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত
বাংলাদেশ সরকার (পরিকল্পনা কমিশন) ২০২০-২০২৪ ১২.০ ৩ (জেলা পর্যায়ে) নির্মাণাধীন, অগ্রগতি ধীর
World Bank (প্রস্তাবিত সহায়তা) ২০২৩-২০২৭ ২৫.০ ৫ (আঞ্চলিক কেন্দ্র) সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে
ADB (প্রস্তাবিত সহায়তা) ২০২৪-২০২৮ ১৮.০ ৪ (বিভাগীয় সদর) প্রাথমিক আলোচনা চলমান
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (পাইলট প্রকল্প) ২০২৫-২০৩০ ৩০.০ ৫ (প্রথম ধাপ) প্রাথমিক সমীক্ষা সম্পন্ন

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, World Bank এবং ADB-এর পাবলিক ডকুমেন্ট।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি-২০১৩' এর ৪.৪ ধারা (ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন) এবং ৪.৬ ধারা (নারী ক্রীড়ার উন্নয়ন) এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট 'নারী ক্রীড়াবিদ হোস্টেল নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ বিধিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যা হোস্টেলের মান, নিরাপত্তা, পুষ্টি ও চিকিৎসা সুবিধার একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করবে এবং এর বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনকে 'জাতীয় বাজেট' বরাদ্দের সময় নারী ক্রীড়া অবকাঠামো, বিশেষ করে হোস্টেল নির্মাণ ও আধুনিকীকরণের জন্য একটি আলাদা বাজেট লাইন নির্ধারণ করতে হবে এবং World Bank ও ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে 'ন্যাশনাল স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড'-এ পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে 'ক্রীড়া আইন-২০১৮' এর ক্ষমতাবলে প্রতিটি জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাকে হোস্টেল পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে, যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি নারী ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং বিশেষজ্ঞ পুষ্টিবিদদের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করে হোস্টেলের সার্বিক কার্যক্রম নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা আক্তার

রেহানা আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator