বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

সালাহউদ্দিন আহমেদ  avatar   
সালাহউদ্দিন আহমেদ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি: 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথরিন তাই-এর দক্ষিণ এশিয়া সফর এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের উপর তার...

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি ক্যাথরিন তাই-এর দক্ষিণ এশিয়া সফর এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের উপর তার জোর দেওয়া 'ফ্রেন্ডশরিং' ধারণার প্রায়োগিক দিকটিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খলের ভঙ্গুরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে, যেখানে দেশগুলো তাদের কৌশলগত অংশীদারদের সাথে সরবরাহ শৃঙ্খলকে কেন্দ্রীভূত করতে চাইছে। এই প্রবণতা, যা 'ফ্রেন্ডশরিং' নামে পরিচিত, একদিকে যেমন রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়াচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং জাপানের মতো প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তিগুলো চীন-নির্ভরতা কমাতে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে, যা বাংলাদেশের মতো উৎপাদনমুখী অর্থনীতির জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে। তবে, এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা উভয় ক্ষেত্রেই প্রথাগত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে সাজাতে হবে।

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল কূটনীতিতে 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর উত্থান কেবল অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও একটি প্রতিচ্ছবি। একদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং তাইওয়ানকে ঘিরে চীন-মার্কিন উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। অন্যদিকে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশগুলো নিজেদের সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে, 'ফ্রেন্ডশরিং' ধারণাটি কেবল অর্থনৈতিক লাভালাভের বাইরে গিয়ে কৌশলগত মিত্রতা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর গুরুত্বারোপ করছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর সাথে একীভূত করে এই অঞ্চলে নিজেদের মিত্রদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, যা চীনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ। বাংলাদেশের জন্য এই প্রবণতা একদিকে যেমন তৈরি পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং আইসিটি খাতে নতুন রপ্তানি বাজার এবং বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে, তেমনি অন্যদিকে প্রধান বাজারগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করছে। তবে, এই সম্পর্কগুলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, যেখানে পারস্পরিক আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা মূল ভিত্তি হবে।

এই নতুন মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে তার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর সুবিধা নিতে হলে বাংলাদেশকে কেবল নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করলেই চলবে না, বরং নিজেদেরকে একটি নির্ভরযোগ্য ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে, সার্ক (SAARC) এবং বিমসটেক (BIMSTEC)-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর পুনরুজ্জীবন এবং এগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, সার্ক বর্তমানে কার্যকারিতার দিক থেকে প্রায় নিষ্ক্রিয়। অন্যদিকে, বিমসটেক তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে এখনও কাজে লাগাতে পারেনি। এই ফোরামগুলোকে কার্যকর করতে পারলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে, যা বৈশ্বিক 'ফ্রেন্ডশরিং' ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ, শুল্ক বাধা হ্রাস এবং অবকাঠামোগত সংযোগ স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়াও, ইউএন পিসকিপিং (UN Peacekeeping) মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের এবং সফল অংশগ্রহণ বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যা 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে। এই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিজেকে কেবল একটি অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সূচক ২০২১ সাল ২০২২ সাল ২০২৩ সাল (প্রাক্কলিত)
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৪৪.২ ৫২.১ ৫৬.০
তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বৃদ্ধি (%) ৩২.৭ ৩৬.৫ ১০.২
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) প্রবাহ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ১০৫.৫ ১২০.৩ ১৩০.০
বিমসটেক দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য (%) ৬.১ ৬.৩ ৬.৪
UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের সৈন্য সংখ্যা (প্রায়) ৬৪০০ ৬৮০০ ৭২০০

উৎস: বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), বাংলাদেশ ব্যাংক (BB), BIMSTEC সচিবালয়, জাতিসংঘ (UN)

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আঞ্চলিক জোট, যেমন বিমসটেক, এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে সুসংহত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়ন নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুল্ক বাধা হ্রাস এবং অবকাঠামোগত সংযোগ স্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) যৌথভাবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি 'ফ্রেন্ডশরিং বিনিয়োগ প্যাকেজ' ঘোষণা করবে, যেখানে কৌশলগত দেশগুলোর (যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইইউ) বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, কর সুবিধা এবং দ্রুত বিনিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য 'একক জানালা' সেবা আইনের অধীনে পৃথক একটি ফাস্ট-ট্র্যাক উইন্ডো স্থাপন করা হবে।
  • জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে ইউএন পিসকিপিং মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ইতিবাচক ভূমিকা এবং সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত অংশীদার দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে হবে, যা 'ফ্রেন্ডশরিং' উদ্যোগের আওতায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সালাহউদ্দিন আহমেদ

সালাহউদ্দিন আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator