সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি পেলেও, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে পশ্চিমা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আকর্ষণ কমেনি। বরং, গত পাঁচ বছরে (২০১৯-২০২৩) উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়গুলোতে অধ্যয়নরত। এই প্রবণতা দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে, যা 'পশ্চিমা শিক্ষাবাজারের হাতছানি: বাংলাদেশের মেধাবী তরুণদের প্রবাসমুখী প্রবণতা' শিরোনামে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
এই প্রবাসমুখী প্রবণতার মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো পশ্চিমা দেশগুলির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণার অত্যাধুনিক সুযোগ, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এবং ডিগ্রি অর্জনের পর আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের উজ্জ্বল সম্ভাবনা। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মানির মতো দেশগুলো তাদের শিক্ষা ভিসা নীতি সহজীকরণ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বৃত্তি ও ফেলোশিপ প্রোগ্রাম চালু করার মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণদের আকৃষ্ট করছে। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) তাদের সর্বশেষ কর্মশক্তি জরিপে উল্লেখ করেছে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে ডিগ্রি অর্জনকারীদের মধ্যে প্রায় ৪০% তাদের অর্জিত দক্ষতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা তরুণদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি করছে এবং উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। এর ফলস্বরূপ, দেশ তার সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল মেধাবীদের হারাচ্ছে, যারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন।
শিক্ষার মান ও কর্মসংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনস্থ বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবণতা লক্ষণীয়। স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি)-এর আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক দক্ষ কর্মী, বিশেষত আইটি, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে, উন্নত বেতন এবং জীবনযাত্রার মান বিবেচনা করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্যানুযায়ী, কারিগরি শিক্ষা সম্পন্নকারীদের মধ্যে প্রায় ১৫% শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এই প্রবণতা কেবল উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তির ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের অভ্যন্তরে উচ্চমানের গবেষণা এবং উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং নীতি সহায়তার অভাবও এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
| বছর | উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গমনকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সংখ্যা | কারিগরি/বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হয়ে বিদেশে গমনকারী কর্মীর সংখ্যা (আনুমানিক) | ইউজিসি কর্তৃক অনুমোদিত গবেষণা প্রকল্পের সংখ্যা (দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়) |
|---|---|---|---|
| ২০১৯ | ৭৫,০০০ | ১২,০০০ | ৮৫০ |
| ২০২০ | ৬৮,০০০ | ১০,৫০০ | ৭৯০ |
| ২০২১ | ৮৮,০০০ | ১৪,০০০ | ৯২০ |
| ২০২২ | ১,০০,০০০ | ১৫,৫০০ | ১,০৫০ |
| ২০২৩ | ১,১০,০০০ | ১৭,০০০ | ১,১২০ |
উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪, এনএসডিএ কর্মশক্তি জরিপ ২০২৩, ব্যানবেইস শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৩, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (আনুমানিক)।
সুপারিশ
- ইউজিসি-কে অবশ্যই প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলির গবেষণা বাজেট কমপক্ষে ৩০% বৃদ্ধি করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার জন্য বিশেষ প্রণোদনা (যেমন – ইউজিসি গবেষণা ফেলোশিপ) চালু করতে হবে, যা দেশীয় গবেষকদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে উৎসাহিত করবে।
- ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় মেধা সংরক্ষণ নীতি' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকবে, এবং SEIP এর আওতায় প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের জন্য দেশের শিল্প খাতের সাথে সংযোগ স্থাপন করে আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
- সরকারকে একটি 'মেধা প্রত্যাবর্তন প্রকল্প' (Talent Repatriation Program) চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থান সম্পন্ন করা মেধাবী বাংলাদেশিদের দেশে ফিরে এসে অবদান রাখার জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা, কর সুবিধা এবং উচ্চতর পদে নিয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) কর্তৃক অনুমোদিত হতে পারে।