সম্প্রতি, এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (EPB) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের অপ্রচলিত পণ্যের রফতানি আয় পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়ে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয় যে, দেশের রফতানি খাত পোশাক শিল্পের উপর অত্যধিক নির্ভরতা কাটিয়ে বৈচিত্র্যকরণের পথে হাঁটছে। বিশেষ করে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল সামগ্রী, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের এই অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক হলেও, এর পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচনে বিদ্যমান নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর কার্যকর সমাধান অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা মোট রফতানির প্রায় ৮৫%। এই একক খাতের উপর অতি-নির্ভরশীলতা আন্তর্জাতিক বাজারে অপ্রত্যাশিত চাহিদা পরিবর্তন, বাণিজ্য যুদ্ধ বা অন্য কোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে। অপ্রচলিত পণ্য রফতানির এই ক্রমবর্ধমান ধারা অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা দিতে এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে। তবে, এই খাতগুলোর বিকাশে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রফতানি প্রক্রিয়া সহজীকরণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব একটি বড় বাধা। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রফতানি বৃদ্ধিতে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মান সনদের অভাব এবং কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রধান অন্তরায়। আবার, হালকা প্রকৌশল খাতে বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, কাঁচামাল আমদানি শুল্কের উচ্চহার এবং স্থানীয়ভাবে মানসম্পন্ন উপকরণ উৎপাদনে বিনিয়োগের অভাব এই খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে খর্ব করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব প্রায়শই নতুন রফতানি পণ্যের শুল্ক সুবিধা নির্ধারণ বা বিদ্যমান নীতিমালার পুনর্বিবেচনায় দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য অনিশ্চয়তা বাড়ায়।
অপ্রচলিত পণ্যের রফতানি বৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে শুধুমাত্র রফতানি প্রণোদনা বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বরং সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি স্তরে গুণগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের অপ্রচলিত রফতানি খাতগুলোর জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত অপ্রতুল। পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকার কারণে আমরা উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের বাজারে প্রবেশ করতে পারছি না। যেমন, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে, বেশিরভাগ রফতানি হয় প্রক্রিয়াজাত চামড়া বা আধা-প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে, যেখানে উচ্চমানের ফিনিশড লেদার পণ্যের রফতানি সম্ভাবনা অনেকটাই অব্যবহৃত। এর অন্যতম কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন, ফিনিশিং এবং মান নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। একইসাথে, রফতানিমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে তথ্য প্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর মাধ্যমে মূলধন বাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সুযোগ থাকলেও, অপ্রচলিত খাতের অনেক উদ্যোক্তা পুঁজি সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নন অথবা জটিলতার কারণে এর সুফল নিতে পারছেন না। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে না পারলে, পোশাক শিল্পের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য কেবল একটি স্বপ্নই থেকে যাবে।
| পণ্যের ধরন | ২০২০-২১ (মিলিয়ন ডলার) | ২০২১-২২ (মিলিয়ন ডলার) | ২০২২-২৩ (মিলিয়ন ডলার) | বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি (%) |
|---|---|---|---|---|
| কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য | ৯৫০ | ১১০০ | ১২৫০ | ১৩.১৬ |
| চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য | ৮০০ | ৯৫০ | ১১০৫ | ১৯.০৬ |
| ফার্মাসিউটিক্যালস | ৪৫০ | ৫২০ | ৬০০ | ১৫.৮৯ |
| হালকা প্রকৌশল সামগ্রী | ৩২০ | ৩৮০ | ৪৩৫ | ১৭.৯৭ |
| অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্য | ১৫০০ | ১৭৫০ | ১৯০০ | ১২.৬৭ |
উৎস: এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (EPB) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ।
সুপারিশ
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে "অপ্রচলিত পণ্য রফতানি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৩" (Non-Traditional Export Development Policy 2023) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি অপ্রচলিত খাতের জন্য নির্দিষ্ট প্রণোদনা, শুল্ক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নীতিমালায় NBR-এর সাথে সমন্বয় করে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক রেয়াত এবং রফতানি প্রক্রিয়ায় ভ্যাট ফেরত দ্রুতায়নের জন্য সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা যুক্ত করা আবশ্যক।
- EPB-কে আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও পণ্য বহুমুখীকরণের জন্য একটি বিশেষ "রফতানি বাজার তথ্য কেন্দ্র" স্থাপন করতে হবে, যা অপ্রচলিত পণ্য রফতানিকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক চাহিদা, মানদণ্ড এবং শুল্কমুক্ত বাজার (যেমন EU-এর GSP+) সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করবে। একইসাথে, CPD-এর সুপারিশ অনুযায়ী, এই কেন্দ্র R&D খাতে বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করবে।
- BSEC-কে অপ্রচলিত রফতানিমুখী SME প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মূলধন বাজার থেকে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে "এসএমই বোর্ড" (SME Board) এর তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ইনসেনটিভ প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যাতে তারা ইক্যুইটি অর্থায়ন বা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সংগ্রহে আগ্রহী হয়।