সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার পদধ্বনি: বাঘ ও বাঘিনীর নীরব সংগ্রাম | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার পদধ্বনি: বাঘ ও বাঘিনীর নীরব সংগ্রাম

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার পদধ্বনি: বাঘ ও বাঘিনীর নীরব সংগ্রাম
সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার পদধ্বনি: বাঘ ও বাঘিনীর নীরব সংগ্রাম
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, গত দশ বছরে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের তুলনায় বাংলাদেশ অংশে লবণাক্ততার হার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ, যা বন বিভাগের ন...

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, গত দশ বছরে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের তুলনায় বাংলাদেশ অংশে লবণাক্ততার হার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ, যা বন বিভাগের নিয়মিত মনিটরিং ডেটা দ্বারা সমর্থিত। বিশেষ করে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার সীমান্তবর্তী সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার মাত্রা ৫ পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড) ছাড়িয়ে যাচ্ছে নিয়মিত, যা বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর পানীয় জলের উৎসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বন অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই প্রপঞ্চকে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রের জন্য একটি নীরব হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।

সুন্দরবনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাঘের বিচরণ ক্ষেত্রগুলোতে পানীয় জলের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের অর্থায়নে পরিচালিত একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাঘের প্রধান শিকার হরিণ ও শূকরের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং তাদের লবণাক্ততা সহনশীলতা হ্রাস পাওয়ায় বাঘের খাদ্যের যোগানও ব্যাহত হচ্ছে। মিঠাপানির উৎস কমে যাওয়ায় বাঘকে লোকালয়ের কাছাকাছি আসতে দেখা যাচ্ছে, যা মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঘটনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত পাঁচ বছরে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়কালে কমপক্ষে ৭টি বাঘ লোকালয়ে প্রবেশের পর মারা পড়েছে বা উদ্ধার করা হয়েছে। DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) এর ফিল্ড রিপোর্ট অনুযায়ী, সুন্দরবনের মিষ্টি পানির আধারগুলোতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ স্থানীয় কৃষি উৎপাদনকেও প্রভাবিত করছে, যার ফলে বাঘের প্রাকৃতিক শিকার হরিণের খাদ্য উৎসও সংকুচিত হচ্ছে।

লবণাক্ততার এই নিরন্তর বৃদ্ধি কেবল বাঘের জীবনচক্রকেই নয়, সুন্দরবনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকেও বিপন্ন করছে। BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল) এর গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরী, গেওয়া ও গরান গাছের মতো লবণাক্ততা-অসহিষ্ণু প্রজাতির বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, যা বনের ঘনত্ব ও প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন সংলগ্ন কৃষি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ধানের উৎপাদন কমেছে এবং কৃষকদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের উপর মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি বনের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং বাঘের আবাসস্থলকে আরও সংকুচিত করছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী দুই দশকে সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেতে পারে এবং প্রজনন হারও কমে যাবে।

সাল সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে গড় লবণাক্ততা বৃদ্ধি (পিপিটি) বাঘের আক্রমণে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা (সুন্দরবন সংলগ্ন) মিষ্টি পানির উৎসের সংখ্যা হ্রাস (শতাংশ)
২০১০ ১.৫ ৩ ৫%
২০১৫ ২.৮ ৪ ৮%
২০২০ ৪.২ ৬ ১২%
২০২৩ ৫.১ ৫ ১৫%

উৎস: বন অধিদপ্তর, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং DAE এর বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'সুন্দরবন সুরক্ষা ও লবণাক্ততা প্রতিরোধ আইন' প্রণয়ন করতে হবে, যা সুন্দরবনের মিঠাপানির উৎসগুলো সংরক্ষণ এবং লবণাক্ত পানি অনুপ্রবেশ রোধে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও শাস্তিমূলক বিধান অন্তর্ভুক্ত করবে।
  • DAE এবং BARC কে যৌথভাবে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে এবং বিকল্প জীবিকা নির্বাহের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে বনের উপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমে।
  • বন অধিদপ্তরকে 'জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কৌশল ২০১৫' এর অধীনে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে কৃত্রিম মিঠাপানির আধার তৈরি এবং বিদ্যমান আধারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator