ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইইউ'র জ্বালানি নীতি: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইইউ'র জ্বালানি নীতি: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ?

সাদিয়া আফরিন  avatar   
সাদিয়া আফরিন
ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইইউ'র জ্বালানি নীতি: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ?
ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইইউ'র জ্বালানি নীতি: বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ?
ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সূত্রপাত এবং এর প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জ্বালানি নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, বিশে...

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সূত্রপাত এবং এর প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জ্বালানি নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে রপ্তানি খাতে, এক নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। জার্মানির কোলন ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২ সালে ইইউতে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৬০% কমে যাওয়ায় জোটভুক্ত দেশগুলো বিকল্প উৎস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, যা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার হিসেবে ইইউ-এর আমদানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তন শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বরং ইইউ-এর কার্বন নিঃসরণ হ্রাস লক্ষ্যমাত্রাকেও ত্বরান্বিত করেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ইইউতে পণ্য রপ্তানিকারী দেশগুলোর উপর, বিশেষত পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের মতো জ্বালানি-নির্ভর উৎপাদন খাতের উপর।

ইইউ-এর নতুন জ্বালানি নীতি, যা ‘REPowerEU’ নামে পরিচিত, ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর অংশ হিসেবে, ইইউ কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ২০২৬ সাল থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রয়োগ করা হবে। CBAM মূলত উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী পণ্য যেমন সিমেন্ট, সার, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং বিদ্যুৎ আমদানির উপর একটি শুল্ক আরোপ করবে, যা ইইউ-এর নিজস্ব শিল্পগুলিকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে এবং বৈশ্বিকভাবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে উৎসাহিত করবে। যদিও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক সরাসরি CBAM-এর আওতায় নেই, তবে এর প্রভাব পরোক্ষভাবে সুদূরপ্রসারী হতে পারে। ইউরোপীয় ক্রেতারা তাদের সাপ্লাই চেইনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর জন্য উৎপাদক দেশগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করবে, যা বাংলাদেশের শিল্প কারখানাগুলোকে সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে বাধ্য করবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এই বিষয়ে ইইউ-এর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে নীতিগত পরিবর্তনগুলো বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পের জন্য অনুকূল হয়।

ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে যে ব্যাঘাত ঘটেছে, তা ইইউ-এর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে আরও জোরদার করেছে। ইইউ এখন শুধু জ্বালানি নয়, বরং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও কাঁচামালের জন্য একক উৎসের উপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। এর ফলস্বরূপ, ইইউ তাদের বাণিজ্য অংশীদারদের কাছ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও শ্রম বিষয়ক মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। একদিকে, ইইউ-এর বাজার ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের শিল্পগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে, এই পরিবর্তনগুলো নতুন বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করতে পারে, যদি বাংলাদেশ সময়োপযোগী নীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল অংশগ্রহণ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির প্রতি অঙ্গীকার ইইউ-এর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে, যা বাণিজ্য আলোচনায় সহায়ক হবে। ইইউ-এর ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ আইন, যা পরিবেশগত ও মানবাধিকার মান পূরণের উপর জোর দেয়, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

বছর ইইউতে বাংলাদেশের রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ইইউতে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ হ্রাস (%) ইইউ-এর নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি (%)
২০২০ ১৬.৮ -২০ +৫
২০২১ ২০.৫ -৩০ +৭
২০২২ ২৩.৮ -৬২ +১২
২০২৩ (প্রাক্কলিত) ২৫.৩ -৮০ +১৫

উৎস: ইউরোপীয় কমিশন, বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং আইইএ (IEA) এর সম্মিলিত প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (BIDA) অবিলম্বে 'সবুজ শিল্প রূপান্তর তহবিল' (Green Industry Transformation Fund) গঠন করতে হবে, যা ইইউ-এর CBAM এবং ডিউ ডিলিজেন্স আইন মেনে চলতে সক্ষম নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকারী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা দেবে।
  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC এবং সার্ক-এর মাধ্যমে ইইউ-এর সঙ্গে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যেখানে ইইউ-এর নতুন পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি সহায়তার বিষয়ে যৌথভাবে আলোচনা করা হবে, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ইইউ-এর নতুন জ্বালানি ও পরিবেশ নীতি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটা হাব তৈরি করতে হবে এবং রপ্তানিকারকদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যা তাদের ইইউ-এর পরিবর্তিত আমদানি বিধিমালা এবং সাপ্লাই চেইন ডিউ ডিলিজেন্স নির্দেশিকা সম্পর্কে অবগত রাখবে ও প্রস্তুতি গ্রহণে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাদিয়া আফরিন

সাদিয়া আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator