চিপ সংকটের পর: বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে স্থানীয়করণ ও বিদেশি নির্ভরতার ফাঁদ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চিপ সংকটের পর: বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে স্থানীয়করণ ও বিদেশি নির্ভরতার ফাঁদ

রাইয়ান হোসেন  avatar   
রাইয়ান হোসেন
চিপ সংকটের পর: বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে স্থানীয়করণ ও বিদেশি নির্ভরতার ফাঁদ
চিপ সংকটের পর: বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে স্থানীয়করণ ও বিদেশি নির্ভরতার ফাঁদ
ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সংকটের প্রভাবে ২০২২ সালে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন খাতে প্রায় ১৫-২০% উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল, যা স্থানীয় সংযোজন শিল্পে কাঁচামাল সরবরা...

বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সংকটের প্রভাবে ২০২২ সালে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন খাতে প্রায় ১৫-২০% উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল, যা স্থানীয় সংযোজন শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বিশেষ করে, স্মার্টফোন এবং কম্পিউটার যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারকরা, যারা মূলত বিদেশি চিপসেটের ওপর নির্ভরশীল, তারা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খেয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের ইলেকট্রনিক্স খাতের বিদেশি নির্ভরতার দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে, যেখানে স্থানীয় মূল্য সংযোজন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্প, যা মূলত পণ্য সংযোজন এবং সীমিত পরিসরে যন্ত্রাংশ উৎপাদনে মনোনিবেশ করেছে, চিপ সংকটের কারণে তার ভঙ্গুরতা প্রকাশ করেছে। বিদেশের বাজারে সেমিকন্ডাক্টরের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সরাসরি স্থানীয় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে, ভোক্তাদের জন্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম বেড়েছে এবং দেশীয় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। এই সংকট কেবল উৎপাদন ব্যাহত করেনি, বরং উদ্ভাবন এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, কারণ প্রয়োজনীয় চিপের সহজলভ্যতা না থাকায় নতুন পণ্য ডিজাইন ও প্রোটোটাইপিং বিলম্বিত হয়েছে। সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যদিও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি এবং অন্যান্য স্থানে বেশ কয়েকটি হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে ইলেকট্রনিক্স এবং আইসিটি হার্ডওয়্যার উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তবে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও ফ্যাব্রিকেশনের মতো উচ্চমূল্যের সংযোজন শিল্পে বিনিয়োগ এখনও অপ্রতুল। এই পার্কগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চললেও, স্থানীয়ভাবে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং বিপুল বিনিয়োগের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এর ফলে, স্থানীয়করণ প্রক্রিয়া মূলত অ্যাসেম্বলিং স্তরেই আটকে আছে, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়।

বিদেশি নির্ভরতার এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স খাতের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ প্রয়োজন, যেখানে কেবল অ্যাসেম্বলিং নয়, বরং চিপ ডিজাইন, ফ্যাব্রিকেশন এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এর মতো উচ্চমূল্যের কার্যক্রমকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) যৌথভাবে দেশীয় সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন একটি অত্যন্ত পুঁজি-ঘন এবং প্রযুক্তি-নিবিড় শিল্প, যার জন্য আরও ব্যাপক সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। এই খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) যেখানে টেলিকম খাতের প্রবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখে, সেখানে ইলেকট্রনিক্স হার্ডওয়্যার উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা ও প্রণোদনার অভাব পরিলক্ষিত হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিশন বাস্তবায়নে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে কাজ করলেও, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের মূল ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য সেমিকন্ডাক্টর খাতের গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বর্তমানে, দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ব্যবহৃত চিপসের প্রায় ৯৫% বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে সামান্যতম ব্যাঘাতও পুরো শিল্পকে স্থবির করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি জাতীয় ইলেকট্রনিক্স নীতি এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অপরিহার্য, যা দেশীয় মেধাস্বত্ব এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।

খাত ২০২০ সালের আমদানি নির্ভরতা (%) ২০২২ সালের আমদানি নির্ভরতা (%) ২০২৫ সালের প্রক্ষেপিত আমদানি নির্ভরতা (%)
স্মার্টফোন চিপসেট ৯৮% ৯৯% ৯৯%
কম্পিউটার প্রসেসর ১০০% ১০০% ১০০%
ইলেকট্রনিক্স কম্পোনেন্টস (সাধারণ) ৯০% ৯৫% ৯৫%
স্থানীয় মূল্য সংযোজন (গড়) ২০% ১৫% ২০%

উৎস: বিটিআরসি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন, ২০২০-২০২২

সুপারিশ

  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এর অধীনে একটি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর উন্নয়ন বোর্ড (National Semiconductor Development Board) গঠন করা, যা সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ফ্যাব্রিকেশন এবং R&D-তে বিনিয়োগের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'সেমিকন্ডাক্টর ইনসেনটিভ পলিসি' (Semiconductor Incentive Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে এবং ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্টে ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এর মাধ্যমে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ল্যাব ও ফ্যাব্রিকেশন ইনকিউবেটর' স্থাপন করা, যেখানে BASIS এবং a2i-এর সহযোগিতায় দেশীয় প্রকৌশলীদের জন্য চিপ ডিজাইন টুলস এবং প্রোটোটাইপিং সুবিধা দেওয়া হবে, এবং আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা।
  • BTRC এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাইক্রোইলেকট্রনিক্স এবং ভিএলএসআই (VLSI) ডিজাইন বিষয়ক বিশেষায়িত কারিকুলাম চালু করা এবং শিল্প-একাডেমিয়া অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০০ জন দক্ষ সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা, যার জন্য 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ' (NSDA) এর মাধ্যমে বিশেষ বৃত্তি ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাইয়ান হোসেন

রাইয়ান হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator