শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট: আইপিও বুমের আড়ালে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট: আইপিও বুমের আড়ালে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট: আইপিও বুমের আড়ালে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড
শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট: আইপিও বুমের আড়ালে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (IPO) অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আরোপের ফলে নতুন তালিকাভুক্তির সংখ্য...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (IPO) অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আরোপের ফলে নতুন তালিকাভুক্তির সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও, বাজারে এখনো বহু অপেক্ষমাণ কোম্পানি রয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (DSE) মাত্র দুটি নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের গড় তালিকাভুক্তির সংখ্যার (প্রায় ৫-৭টি) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন ভালো কোম্পানির প্রতি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, অন্যদিকে বিএসইসিকে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে, বিশেষ করে যখন আইপিও বুমের আড়ালে কিছু কোম্পানির দুর্বল মৌলভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় তালিকাভুক্তির মানদণ্ড একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। বিগত বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০১০ সালের বাজার ধসের পর, বিএসইসি আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কার এনেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতি থেকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির প্রবর্তন, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নির্ধারিত হয়। তবে, এই পদ্ধতিতেও কিছু ত্রুটি দেখা গেছে, যেমন 'স্লট ট্রেডিং' বা সিন্ডিকেট করে উচ্চ দর প্রস্তাবের মাধ্যমে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা, যা পরবর্তীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) এবং DSE উভয়ই তাদের তালিকাভুক্তির শর্তাবলীতে কিছু পরিবর্তন এনেছে, যার মধ্যে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন, মুনাফার ধারাবাহিকতা এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বচ্ছতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, মূলধনী বাজারের সামগ্রিক মানোন্নয়নের জন্য শুধুমাত্র প্রাথমিক শর্তাবলী কঠোর করলেই চলবে না, বরং তালিকাভুক্তির পরবর্তী নিরীক্ষা (post-listing scrutiny) এবং কর্পোরেট গভর্নেন্সের উপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ জরুরি। বহু কোম্পানি আইপিও পরবর্তী সময়ে তাদের প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত ব্যবসা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বা মুনাফার প্রক্ষেপণ পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছে।

আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিএসইসি'র ভূমিকা ক্রমশ আরও সতর্কতামূলক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, সম্পদের মূল্যায়ন, এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজার রুলস এবং মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি, বিএসইসি কোম্পানিগুলোর স্পন্সর-ডিরেক্টরদের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করেছে, যাতে উদ্যোক্তারা কোম্পানির প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এবং স্টক এক্সচেঞ্জগুলোও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নত করার মাধ্যমে বাজারকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করার চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আইপিও আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। কিন্তু, আইপিও আবেদনের এই সহজলভ্যতা অনেক সময় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোম্পানির মৌলভিত্তি যাচাই না করেই বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়, যা বাজারে ফটকাবাজারি (speculation) উৎসাহিত করতে পারে। তাই, বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা প্রদানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা আবশ্যক।

বছর DSE-তে তালিকাভুক্ত নতুন কোম্পানির সংখ্যা (IPO) মোট IPO আবেদনের পরিমাণ (কোটি টাকা) গড় তালিকাভুক্তির পরের ১ বছরের শেয়ার মূল্যের পরিবর্তন (%)
২০১৯ ৮ ২,৫০০ +১২.৫%
২০২০ ১০ ৩,২০০ +৮.০%
২০২১ ১২ ৪,১০০ -৫.২%
২০২২ ৭ ২,৮০০ -১০.৭%
২০২৩ ৫ ১,৯৫০ -৭.৯%
২০২৪ (মে পর্যন্ত) ২ ১,৩০০ (তথ্য অপ্রাপ্য)

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) বার্ষিক প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক প্রণীত 'কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮' এর বাস্তবায়ন আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত, বিশেষ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ এবং নিরীক্ষা কমিটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে। বিএসইসিকে ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ও পরিচালনা পর্ষদের স্বচ্ছতা নিয়মিত যাচাই করতে হবে এবং কোড লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) তাদের তালিকাভুক্তির পরবর্তী পর্যবেক্ষণ (post-listing monitoring) প্রক্রিয়া শক্তিশালী করবে, যাতে আইপিও তহবিল ব্যবহারের সঠিকতা এবং প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত ব্যবসা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে, কোম্পানিগুলোর ক্যাপিটাল এক্সপোজার সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত বিরতিতে প্রকাশ করা এবং কোনো গুরুতর বিচ্যুতির ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে।
  • সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এবং বিএসইসি'র যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি চালু করা উচিত। বিশেষ করে, আইপিওতে বিনিয়োগের ঝুঁকি, মৌলভিত্তি বিশ্লেষণের গুরুত্ব এবং গুজব এড়িয়ে চলার বিষয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য অনলাইন কোর্স, সেমিনার এবং সহজে বোধগম্য নির্দেশিকা (যেমন 'বিনিয়োগকারী হ্যান্ডবুক') তৈরি ও বিতরণ করা যেতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator