আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল তথ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল তথ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের কৌশল

তানজিম কবির  avatar   
তানজিম কবির
আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল তথ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের কৌশল
আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল তথ্যের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর একটি প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক সাইবার পরিসরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ভুল তথ্যের প্রচা...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর একটি প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক সাইবার পরিসরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ভুল তথ্যের প্রচারণার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো প্রায়শই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কীভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বা রাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সুকৌশলে ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, যা কেবল অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ধরনের সাইবার হুমকির বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা একাধিকবার প্রকাশ করেছে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে, ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে (UN Peacekeeping) বাংলাদেশের সৈন্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার যে চেষ্টা অতীতে দেখা গেছে, তা কেবল দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা নয়, বরং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা।

এই ভুল তথ্যের যুদ্ধ শুধুমাত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা অপপ্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে সরাসরি প্রভাবিত করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার হামলা এবং ভুল তথ্য প্রচারণার উদ্দেশ্য প্রায়শই বহুমুখী হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টি, জনমতকে প্রভাবিত করা, নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, বাণিজ্য চুক্তিতে বাধা সৃষ্টি করা, বা নির্দিষ্ট একটি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে আন্তর্জাতিক সমর্থন হ্রাস করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে লক্ষ্য করে পরিবেশগত বা শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের মিথ্যা অভিযোগ প্রচার করা হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করে এবং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ধরনের প্রচারণা প্রায়শই ছদ্মবেশী সংবাদ ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং প্রভাবিত 'ইনফ্লুয়েন্সার'দের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা সনাক্ত করা এবং মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। আধুনিক সাইবার কূটনীতিতে, কেবল নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; ভুল তথ্যের আখ্যানকে (narrative) মোকাবিলা করা এবং সত্য তথ্য প্রতিষ্ঠা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সুসংহত এবং বহু-মাত্রিক কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য। আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং সার্ক (SAARC) প্ল্যাটফর্মগুলো সাইবার নিরাপত্তা এবং ভুল তথ্য মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো সাইবার হুমকি সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন এবং সাইবার হামলার বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যা এই অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল তথ্যের প্রচারণার বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত প্রাচীর তৈরি করতে পারে। একইভাবে, সার্কের অধীনে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে একটি আঞ্চলিক চুক্তি বা প্রোটোকল স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো এবং সাইবার স্পেসে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে সম্মিলিত আইনি এবং প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে সাইবার কূটনীতির এজেন্ডাকে আরও এগিয়ে নিতে হবে এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ফ্রন্ট গঠনে নেতৃত্ব দিতে হবে।

সংস্থা/প্রতিষ্ঠান সাইবার হুমকি/ভুল তথ্যের বিষয়ে পদক্ষেপ প্রভাবিত সাল/সময়কাল উৎস/প্রাসঙ্গিক তথ্য
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘে ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে প্রস্তাবনা উত্থাপন, আন্তর্জাতিক ফোরামে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে আহ্বান। ২০২১-২০২৩ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন
BIMSTEC সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের আলোচনা, আঞ্চলিক তথ্য আদান-প্রদান প্রক্রিয়া। ২০২২-২০২৩ BIMSTEC সচিবালয়, বিভিন্ন মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক
UN Peacekeeping বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্যের প্রচারণা মোকাবিলায় জাতিসংঘের বিবৃতি ও সমর্থন। ২০২০-২০২২ জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অফ পিস অপারেশনস (DPO)
সার্ক (SAARC) সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) সহযোগিতার কাঠামো। ২০১৯-২০২১ সার্ক সচিবালয়, সার্ক আইসিটি মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন

উৎস: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, BIMSTEC সচিবালয়, জাতিসংঘ ডিপার্টমেন্ট অফ পিস অপারেশনস (DPO), সার্ক সচিবালয় এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি বিশেষায়িত 'সাইবার কূটনীতি ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক সাইবার হুমকি, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভুল তথ্যের প্রচারণা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরিচালিত হবে। এই ইউনিট আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়নে সহায়তা করবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি (National Cyber Security Agency - NCSA)-এর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করে একটি জাতীয় 'কৌশলগত যোগাযোগ কাঠামো' (Strategic Communication Framework) তৈরি করতে হবে, যা দ্রুত এবং নির্ভুল তথ্য প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ছড়ানো ভুল তথ্যকে প্রতিহত করবে। এই কাঠামো জাতিসংঘের 'গ্লোবাল কাউন্টার-টেররিজম স্ট্র্যাটেজি'র (Global Counter-Terrorism Strategy) আওতায় ভুল তথ্য মোকাবিলায় ব্যবহৃত কৌশলগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হতে পারে।
  • BIMSTEC এবং সার্কের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা বাড়াতে হবে এবং 'সাইবার নিরাপত্তা ও ভুল তথ্য মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তি' (Regional Cooperation Agreement on Cyber Security and Disinformation) স্বাক্ষরের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যেখানে সাইবার হামলা ও ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য যৌথভাবে আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিম কবির

তানজিম কবির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator