ফাস্ট ফ্যাশনের আগ্রাসন: টেকসই পোশাকের পথে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের লড়াই | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফাস্ট ফ্যাশনের আগ্রাসন: টেকসই পোশাকের পথে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের লড়াই

নাবিলা পারভীন  avatar   
নাবিলা পারভীন
ফাস্ট ফ্যাশনের আগ্রাসন: টেকসই পোশাকের পথে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের লড়াই
ফাস্ট ফ্যাশনের আগ্রাসন: টেকসই পোশাকের পথে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের লড়াই
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন পরিবেশগত নীতিমালার ঘোষণা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে টেকসই উৎপ...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন পরিবেশগত নীতিমালার ঘোষণা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে টেকসই উৎপাদন ও পরিবেশ-বান্ধব পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই নীতিমালার আওতায় ফাস্ট ফ্যাশনের পণ্য উৎপাদন ও বিপণন আরও কঠোর নজরদারির মধ্যে আসবে, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একাধারে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ উভয়ই তৈরি করেছে। একদিকে বিশ্বজুড়ে ফাস্ট ফ্যাশনের আগ্রাসী বিপণন কৌশল এবং স্বল্পমূল্যে দ্রুত পোশাক উৎপাদনের প্রবণতা ছোট উদ্যোক্তাদের টিকে থাকাকে কঠিন করে তুলছে, অন্যদিকে পরিবেশ-সচেতন ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার কড়াকড়ি টেকসই পোশাকের দিকে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কীভাবে ফাস্ট ফ্যাশনের উন্মত্ত প্রতিযোগিতার মাঝে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে টেকসই পোশাকের পথে হাঁটতে পারে, তা নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

ফাস্ট ফ্যাশনের মূল মন্ত্র হলো দ্রুত উৎপাদন, স্বল্প মূল্য এবং ক্ষণস্থায়ী প্রবণতা। এর ফলে পোশাক শিল্পে বর্জ্যের পাহাড় তৈরি হচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক পোশাক শিল্পের মাত্র ১% পোশাক পুনর্ব্যবহার করা হয়, যেখানে প্রতি সেকেন্ডে এক ট্রাক ভর্তি পোশাক বর্জ্য ল্যান্ডফিলে ফেলা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানির উপর নির্ভরশীল, তাদের উপর পরিবেশগত চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃহৎ রপ্তানিমুখী পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) এবং বিকেএমইএ (BKMEA) এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় বিনিয়োগের সক্ষমতা রাখলেও, দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যারা মূলত স্থানীয় বাজার এবং ছোট পরিসরে রপ্তানির দিকে মনোযোগী, তারা এই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাদের পক্ষে ব্যয়বহুল পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ করা, জৈব কাঁচামাল সংগ্রহ করা অথবা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরীক্ষা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফাস্ট ফ্যাশনের সস্তা পণ্যের সহজলভ্যতা যখন ভোক্তাদের দ্রুত ফ্যাশন পরিবর্তনের দিকে আকৃষ্ট করছে, তখন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের তৈরি উচ্চমানের, দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রায়শই হস্তশিল্প-নির্ভর টেকসই পোশাকের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা দেশের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প এবং হস্তশিল্পের ভবিষ্যৎকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

এই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের কিছু সাহসী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা টেকসই ফ্যাশনের পথ বেছে নিয়েছেন এবং তাদের পণ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে। তারা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রাকৃতিক তন্তু, যেমন – পাট, তুলা ও রেশম ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করছেন এবং পরিবেশ-বান্ধব রঞ্জন পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন। কিছু কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোগ কর্মীদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে 'ফেয়ার ট্রেড' নীতি অনুসরণ করছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে তাদের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যদিও মোট পোশাক রপ্তানিতে টেকসই ফ্যাশনের অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে কম, তবে বিগত পাঁচ বছরে এর প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে ছোট পরিসরে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এই উদ্যোক্তারা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, যা তাদের ফাস্ট ফ্যাশনের বড় ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে একটি স্বতন্ত্র বাজার তৈরি করতে সাহায্য করছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) যদি এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য টেকসই উৎপাদন ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সহজ ও কার্যকরী নির্দেশিকা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে, তাহলে এই খাত আরও শক্তিশালী হতে পারে। তাছাড়া, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো গেলে উৎপাদন খরচও কিছুটা কমানো সম্ভব, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।

বছর মোট পোশাক রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) টেকসই পোশাক রপ্তানির আনুমানিক অংশ (%) ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সংখ্যা (পোশাক খাত) পোশাক খাতে পরিবেশগত নিরীক্ষায় অনুগত ক্ষুদ্র উদ্যোগের হার (%)
২০১৯-২০ ৩৩.০৭ ৩.৫ ৭,২০০ ৮.২
২০২০-২১ ৩৮.৭৬ ৪.১ ৬,৯৫০ ৯.৫
২০২১-২২ ৪১.৩৪ ৪.৯ ৭,১০০ ১১.৩
২০২২-২৩ ৪৬.৯৯ ৫.৬ ৭,৩০০ ১২.৮

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), BGMEA, BKMEA এবং DIFE-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও প্রক্ষেপণ। (বিশেষ দ্রষ্টব্য: টেকসই পোশাকের অংশ এবং পরিবেশগত নিরীক্ষায় অনুগত ক্ষুদ্র উদ্যোগের হার একটি আনুমানিক হিসাব, যা বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের উপর ভিত্তি করে তৈরি।)

সুপারিশ

  • সরকারকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (BSCIC)-এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য 'টেকসই পোশাক উৎপাদন তহবিল' গঠন করতে হবে, যা পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ ও জৈব কাঁচামাল ক্রয়ে সহজ শর্তে ঋণ এবং অনুদান প্রদান করবে।
  • কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (BAB)-কে যৌথভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহজবোধ্য ও সাশ্রয়ী 'টেকসই উৎপাদন মানদণ্ড' তৈরি করতে হবে এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) এবং বিকেএমইএ (BKMEA)-কে তাদের বৃহৎ সদস্যদের সাথে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংযোগ স্থাপনে একটি 'মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম' চালু করতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা টেকসই সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাজার অ্যাক্সেস সম্পর্কে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা পারভীন

নাবিলা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফ্যাশন, লাইফস্টাইল ও টেকসই পোশাক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator