অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার অবসান নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার অবসান নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার অবসান নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?
অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার অবসান নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রম, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় এ...

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রম, বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ করে দেওয়া। এই পরিবর্তনকে অনেকে মুখস্থ বিদ্যার অবসান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ একে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। বিশেষ করে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের পরিপূর্ণ বিকাশে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা ও বিতর্ক চলমান।

নতুন শিক্ষাক্রমের প্রাণকেন্দ্র হলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন, যা শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে উৎসাহিত করে। এই পদ্ধতিতে পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় আবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীরা প্রজেক্ট, দলবদ্ধ কাজ, ফিল্ড ট্রিপ এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শেখে। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান বিষয়ে কেবল তত্ত্ব মুখস্থ না করে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ছোট ছোট পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করে, যা তাদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসু মন তৈরি করে। এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়, যা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপরিহার্য। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্যমতে, দেশের প্রাথমিক স্তরে প্রায় ২ কোটি এবং মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ১.২ কোটি শিক্ষার্থী এই নতুন পদ্ধতির আওতায় আসবে। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত শিক্ষণ পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা একটি বড় কাজ। বর্তমান শিক্ষাক্রমে মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে প্রচলিত পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং পারফরম্যান্স ভিত্তিক অ্যাসাইনমেন্টের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এটি শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল এবং ফলপ্রসূ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ এতে তাদের মুখস্থ করা তথ্যের পরিবর্তে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ থাকবে।

তবে, এই যুগান্তকারী পরিবর্তন বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট। অভিজ্ঞ শিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার অভাব এই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে যেখানে ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আধুনিক শিক্ষণ উপকরণের অভাব রয়েছে, সেখানে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যদিও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে থাকে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এই ধরনের ব্যবহারিক শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও মানসিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। অনেক শিক্ষক যারা দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পদ্ধতিতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি আয়ত্ত করা এবং শ্রেণিকক্ষে তা সফলভাবে প্রয়োগ করা একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। UGC (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) এর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যারা শিক্ষক হিসেবে আসছেন, তাদের নতুন শিক্ষাক্রমের সাথে পরিচিত করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, NSDA (জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) এর সাথে সমন্বয় করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের জন্য এমন কিছু দক্ষতা ভিত্তিক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে, এই নতুন শিক্ষাক্রম মুখস্থ বিদ্যার অবসান না ঘটিয়ে বরং আরও নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।

শিক্ষাবর্ষ নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার (প্রাথমিক) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার (মাধ্যমিক)
২০২৩ ৬,৬১০ ৬,২১৫ ৪২% ৩৭%
২০২৪ (প্রক্ষেপিত) ৬২,০০০+ ২০,০০০+ ৭০% ৬০%
২০২৭ (লক্ষ্য) ১০০% ১০০% ১০০% ১০০%

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, BANBEIS, ২০২৩-২০২৪ সালের প্রারম্ভিক রিপোর্ট ও পরিকল্পনা।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই 'জাতীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ নীতি' (National Teacher Training Policy) সংশোধন করে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতির ওপর বাধ্যতামূলক ও নিবিড় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় স্তরের শিক্ষকদের জন্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, বিশেষত গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল এবং ব্যবহারিক সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
  • BANBEIS এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে প্রতিটি বিদ্যালয়ে আধুনিক শিক্ষণ উপকরণ ও ডিজিটাল অবকাঠামো স্থাপনের জন্য একটি পাঁচ বছর মেয়াদী (২০২৫-২০৩০) কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক ও ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত হয়।
  • UGC এবং NSDA-কে যৌথভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক প্রশিক্ষণ কারিকুলামে নতুন শিক্ষাক্রমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মডিউল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মমুখী দক্ষতা বিকাশে সহায়ক এমন প্রজেক্ট-ভিত্তিক কার্যক্রম ডিজাইন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator