তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি: আঞ্চলিক কূটনীতি ও শুষ্ক মৌসুমের শঙ্কা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি: আঞ্চলিক কূটনীতি ও শুষ্ক মৌসুমের শঙ্কা

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি: আঞ্চলিক কূটনীতি ও শুষ্ক মৌসুমের শঙ্কা
তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি: আঞ্চলিক কূটনীতি ও শুষ্ক মৌসুমের শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, গত বছরের শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর-মে) তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে প্রবাহ সর্বনিম্ন ২,০০০ কিউসেকের নিচে নেমে আসার ঘটনা আবারও আঞ্চলিক কূটনীতিতে তিস্তার জল...

সম্প্রতি, গত বছরের শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর-মে) তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে প্রবাহ সর্বনিম্ন ২,০০০ কিউসেকের নিচে নেমে আসার ঘটনা আবারও আঞ্চলিক কূটনীতিতে তিস্তার জলবণ্টন চুক্তির গুরুত্বকে সামনে এনেছে। যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তি সম্পাদনে ইচ্ছুক, পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চুক্তি এখনো আলোর মুখ দেখেনি, যা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, তিস্তার ভারতীয় অংশে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য অপ্রতুল পানি প্রবাহ একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা উভয় দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে একটি জটিল মাত্রা যোগ করেছে।

তিস্তা নদীর পানি বাংলাদেশের প্রায় ১৪ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে সেচ, মৎস্য চাষ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার বিশাল কৃষিভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তথ্যমতে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন প্রায় ১.১১ লক্ষ হেক্টর জমিতে যেখানে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকে, সেখানে পর্যাপ্ত পানির অভাবে প্রায় ৩০-৪০% জমিতে সেচ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শুধু বোরো ধানই নয়, ভুট্টা, গম এবং বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষও ব্যাহত হয়, যার ফলে কৃষক পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) খরা সহনশীল জাত উদ্ভাবনে কাজ করলেও, পানির মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে এসব উদ্ভাবনের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়।

শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রবাহের হ্রাস কেবল কৃষিক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামগ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর নাব্যতা হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং মিঠাপানির মাছের প্রজাতি কমে যাওয়া এই অঞ্চলের একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর গবেষণা অনুযায়ী, তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন এবং পানির অভাব নদীর বাস্তুতন্ত্রে (ecosystem) সরাসরি আঘাত হানছে, যা স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। এছাড়াও, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষ করে ভাটির দিকে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের কৃষি ও পানীয় জলের উৎসকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি বণ্টন চুক্তি আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।

বছর শুষ্ক মৌসুমে গড় প্রবাহ (কিউসেক) বোরো ধানের আবাদকৃত জমি (লক্ষ হেক্টর, তিস্তা সেচ প্রকল্প) ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস (ফুট)
২০১৮ ৪,৫০০ ০.৮৫ ০.৫
২০১৯ ৩,৮০০ ০.৭৮ ০.৭
২০২০ ৩,২০০ ০.৭০ ০.৯
২০২১ ২,৫০০ ০.৬২ ১.২
২০২২ ২,১০০ ০.৫৫ ১.৫
২০২৩ ১,৯০০ ০.৫০ ১.৮

উৎস: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE)

সুপারিশ

  • ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশন (JRC) এর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে তিস্তার পানি বণ্টনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি দ্রুত সম্পাদন করা, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানি প্রবাহের একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে যা তিস্তা সেচ প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত।
  • বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে নদী ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ এবং বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • কৃষি মন্ত্রণালয়, DAE, BARI এবং BRRI-কে যৌথভাবে তিস্তা অববাহিকার জন্য উপযোগী স্বল্প পানি-নির্ভর ও খরা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে গবেষণা ও প্রণোদনা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, একই সাথে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি যেমন ড্রিপ ইরিগেশন ও স্প্রিংকলার ব্যবহারের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator