শহুরে জীবনে 'ডিজিটাল ডিটক্স': সুস্থ মন ও দেহের নতুন মন্ত্র? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শহুরে জীবনে 'ডিজিটাল ডিটক্স': সুস্থ মন ও দেহের নতুন মন্ত্র?

রনি চৌধুরী  avatar   
রনি চৌধুরী
শহুরে জীবনে 'ডিজিটাল ডিটক্স': সুস্থ মন ও দেহের নতুন মন্ত্র?
শহুরে জীবনে 'ডিজিটাল ডিটক্স': সুস্থ মন ও দেহের নতুন মন্ত্র?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের 'ডিজিটাল ওয়েলবিইং রিপোর্ট ২০২৩'-এ শহুরে জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যে ডিজিটাল ডিভাইসের অতি ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভ...

সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের 'ডিজিটাল ওয়েলবিইং রিপোর্ট ২০২৩'-এ শহুরে জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যে ডিজিটাল ডিভাইসের অতি ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঢাকা, মুম্বাই ও জাকার্তার মতো মেগাসিটিগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৪০% ব্যক্তি দৈনিক ৬ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের পেছনে ব্যয় করেন, যা তাদের ঘুমের চক্র, মানসিক স্থিরতা এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্তি এবং সুস্থ জীবনযাপনের জন্য 'ডিজিটাল ডিটক্স' নামক একটি নতুন ধারণার অপরিহার্যতাকে সামনে এনেছে। এটি এখন কেবল একটি ফ্যাশন ট্রেন্ড নয়, বরং আধুনিক শহুরে জীবনের এক অনিবার্য প্রয়োজন, যা মন ও দেহের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সহায়ক।

শহুরে জীবনে ডিজিটাল ডিটক্সের ধারণাটি মূলত স্ক্রিন টাইম কমানো এবং অনলাইন সংযোগ থেকে কিছু সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন থাকার মাধ্যমে মানসিক চাপ হ্রাস করার উপর জোর দেয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণে পরিবর্তন ঘটায়, যা আসক্তির জন্ম দিতে পারে। এছাড়াও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবিরাম প্রবাহ উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মমর্যাদার অভাবের কারণ হয়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ডিজিটাল ডিটক্স অনুশীলন করেন, তাদের মধ্যে মানসিক চাপ প্রায় ৩০% কমে যায় এবং তারা অধিকতর প্রফুল্লতা ও মনোযোগের উন্নতি অনুভব করেন। এমনকি, কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের জন্য 'ডিজিটাল ফ্রি আওয়ার' চালু করেছে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ। এর ফলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা এবং পারস্পরিক যোগাযোগে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, যা কর্মক্ষেত্রের সুস্থ পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হচ্ছে।

ডিজিটাল ডিটক্স শুধুমাত্র মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখের উপর চাপ, ঘাড় ও পিঠের ব্যথা, এবং ঘুমের ব্যাঘাত একটি সাধারণ সমস্যা। বিশেষ করে, রাতের বেলা মোবাইল বা ট্যাবলেটের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদনে বাধা দেয়, যা ঘুমের গুণমানকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি 'ডিজিটাল স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশিকা' প্রকাশ করেছে, যেখানে শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম সীমিত করার এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। World Bank এবং ADB-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'Healthy Cities Initiative' প্রকল্পে শহুরে বাসিন্দাদের জন্য ডিজিটাল ডিটক্স কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কমিউনিটি পর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে। এই কর্মসূচিতে যোগ ব্যায়াম, ধ্যান এবং আউটডোর কার্যকলাপের উপর জোর দেওয়া হবে, যা ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল ডিটক্স এখন ব্যক্তিগত পছন্দ ছাড়িয়ে একটি জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বছর শহুরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (মিলিয়ন) দৈনিক স্ক্রিন টাইম > ৬ ঘণ্টা (%) ডিজিটাল ডিটক্স কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ (%) মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি (%)
২০২০ ৩২.৫ ৪০ ৫ ১০
২০২১ ৩৭.৮ ৪৫ ৭ ১৫
২০২২ ৪৩.২ ৪৮ ১১ ২০
২০২৩ ৪৯.৫ ৫২ ১৫ ২৫

উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ২০২৩ সালের যৌথ সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে, স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সুস্থতা (Digital Wellbeing) সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাপ্তাহিক 'ডিজিটাল বিরতি' (Digital Break) বাধ্যতামূলক করবে, যেখানে কোনো প্রকার স্ক্রিন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে।
  • World Bank ও ADB-এর আর্থিক সহায়তায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় শহুরে এলাকায় 'ডিজিটাল ডিটক্স জোন' প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সবুজ স্থান থাকবে এবং ওয়াইফাই সংযোগ সীমিত থাকবে, যাতে মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটাতে উৎসাহিত হয়।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, টেলিকম অপারেটরদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে, ব্যবহারকারীদের জন্য 'স্ক্রিন টাইম ম্যানেজমেন্ট' অ্যাপ বা ফিচার চালু করতে উৎসাহিত করবে, যা ব্যবহারকারীদের দৈনিক স্ক্রিন টাইম ট্র্যাক করতে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রনি চৌধুরী

রনি চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator