সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলা কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পতন নির্দেশ করে। এই সংকোচন মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপের ফল, যা দেশের নির্মাণ খাতকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ মেটাল, ফেরোঅ্যালয় এবং জিপসামের মতো অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দেশের বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্পগুলো, যেমন - মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প বা পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, যেখানে কাঁচামালের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় কাজের গতি কমে আসছে এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা ইস্পাত ও সিমেন্ট উৎপাদনকারীদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্থানীয় ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রার অপ্রতুলতার কারণে নতুন এলসি খুলতে অনীহা দেখাচ্ছে, অথবা উচ্চ মার্জিন দাবি করছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। World Bank-এর সাম্প্রতিক 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি বিল পরিশোধে চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে, ইস্পাত কারখানায় স্ক্র্যাপ মেটাল, স্পঞ্জ আয়রন এবং ককিং কোলের মতো প্রধান কাঁচামালের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অনেক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিকে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে হয়েছে, কারণ ক্লিংকার আমদানি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি শুধু উৎপাদনকেই প্রভাবিত করছে না, বরং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
এই সংকট নির্মাণ খাতের ওপর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি, সেগুলোও কাঁচামাল সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়ছে। বেসরকারি নির্মাণ খাত, বিশেষ করে আবাসন শিল্প, এই সংকটের শিকার হয়ে নতুন প্রকল্প শুরু করতে দ্বিধা করছে এবং চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের 'রূপকল্প ২০৪১' বাস্তবায়নে অবকাঠামো খাতের ভূমিকা অপরিহার্য। ADB (Asian Development Bank)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ৭-৮ শতাংশ এবং এটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহ করে। কাঁচামালের অনিশ্চিত সরবরাহ এবং মূল্যবৃদ্ধি ঠিকাদারদের জন্য বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন করে তুলেছে, যার ফলে অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হচ্ছে না এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চেপে বসছে। এই ধারাবাহিকতা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
| খাত | ২০২১-২২ (বিলিয়ন ডলার) | ২০২২-২৩ (বিলিয়ন ডলার) | পরিবর্তন (%) |
|---|---|---|---|
| ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল | ১.৮৫ | ১.৪০ | -২৪.৩৪ |
| সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল | ০.৯২ | ০.৬৮ | -২৬.০৮ |
| মোট | ২.৭৭ | ২.০৮ | -২৪.৯১ |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক
সুপারিশ
- বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা এবং এই খাতের এলসি নিষ্পত্তিতে দ্রুততার সাথে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা।
- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) যৌথভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করবে, যা ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল আমদানির বর্তমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, আমদানিকারকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করবে এবং দ্রুত সমাধানের জন্য নীতি সহায়তা দেবে।
- বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় পর্যায়ে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন (যেমন, স্ক্র্যাপ রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন, ক্লিংকারের বিকল্প উপাদান গবেষণা) উৎসাহিত করার জন্য শিল্প নীতিমালার অধীনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ (যেমন, শুল্ক সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদী স্বল্প সুদে ঋণ) ঘোষণা করবে।