বাংলাদেশের অ্যাথলেট পারফরম্যান্সে নিউট্রিশন সায়েন্সের ঘাটতি: অপূর্ণ স্বপ্ন ও সমাধানের সূত্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের অ্যাথলেট পারফরম্যান্সে নিউট্রিশন সায়েন্সের ঘাটতি: অপূর্ণ স্বপ্ন ও সমাধানের সূত্র

ড. আসিফ রায়হান  avatar   
ড. আসিফ রায়হান
বাংলাদেশের অ্যাথলেট পারফরম্যান্সে নিউট্রিশন সায়েন্সের ঘাটতি: অপূর্ণ স্বপ্ন ও সমাধানের সূত্র
বাংলাদেশের অ্যাথলেট পারফরম্যান্সে নিউট্রিশন সায়েন্সের ঘাটতি: অপূর্ণ স্বপ্ন ও সমাধানের সূত্র
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি শেষ হওয়া এশিয়ান গেমস ২০২৩-এ বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের সামগ্রিক পারফরম্যান্স হতাশাজনক ছিল। যেখানে স্বর্ণপদক তো দূর, পদক তালিকায় নাম লেখানোই কঠিন হয়ে...

সম্প্রতি শেষ হওয়া এশিয়ান গেমস ২০২৩-এ বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের সামগ্রিক পারফরম্যান্স হতাশাজনক ছিল। যেখানে স্বর্ণপদক তো দূর, পদক তালিকায় নাম লেখানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো অ্যাথলেটিক্সে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। এই পারফরম্যান্স ঘাটতির একটি মূল কারণ হিসেবে ক্রীড়াবিদদের পুষ্টি বিজ্ঞানের অভাবনীয় অবহেলাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘকাল ধরে আমাদের ক্রীড়াঙ্গনকে পিছিয়ে রেখেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার এই পুষ্টিগত দুর্বলতার প্রতি আলোকপাত করা হলেও, কার্যকর সমাধানের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের জন্য সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানসম্মত এবং ব্যক্তিগতকৃত পুষ্টি পরিকল্পনার অভাব প্রকট। আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে একজন অ্যাথলেটের শারীরিক সক্ষমতা, শক্তি ও দ্রুত পুনরুদ্ধার ক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি, যা সরাসরি সঠিক পুষ্টির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, অধিকাংশ অ্যাথলেট এখনও প্রথাগত খাদ্যাভ্যাসের উপর নির্ভর করে থাকেন, যেখানে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের সঠিক ভারসাম্য প্রায়শই অনুপস্থিত। এমনকি শীর্ষ পর্যায়ের কিছু ক্রীড়াবিদও তাদের খাদ্যাভ্যাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন, যা তাদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেওয়া দেশগুলোর প্রতিটি দলে কমপক্ষে ২-৩ জন পূর্ণকালীন স্পোর্টস নিউট্রিশনিস্ট থাকলেও, বাংলাদেশে হাতেগোনা কিছু ক্লাবে নামমাত্র নিউট্রিশন পরামর্শক দেখা যায়, যার অধিকাংশই প্রশিক্ষিত নন।

এই ঘাটতির মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের অভাব। বাংলাদেশে ক্রীড়া পুষ্টি বিজ্ঞানের উপর উচ্চশিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে, অ্যাথলেটদের জন্য যারা পুষ্টি পরিকল্পনা তৈরি করবেন, সেই বিশেষজ্ঞের সংখ্যাই নগণ্য। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বাজেট বরাদ্দে স্পোর্টস সায়েন্স বা পুষ্টি গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট তহবিল অত্যন্ত অপ্রতুল। World Bank এবং ADB-এর সাম্প্রতিক ক্রীড়া উন্নয়ন সহায়তার প্রকল্পগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেওয়া হলেও, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম। এর ফলে অ্যাথলেটরা পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণ করলেও, তাদের দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক্রো ও ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্টের ভারসাম্যহীনতা পারফরম্যান্সকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে, যা বারবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রমাণিত হচ্ছে।

পুষ্টি বিজ্ঞানের এই অবহেলা শুধু পারফরম্যান্সের উপরই নয়, অ্যাথলেটদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য এবং ক্যারিয়ারের উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে অকালে ঝরে যাওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিশীল ক্রীড়াবিদের পেছনে পুষ্টিগত দুর্বলতা একটি বড় কারণ। পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড়ের দুর্বলতা, ঘন ঘন আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি অ্যাথলেটদের নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি সমন্বিত স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট এবং প্রতিটি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনে একজন পূর্ণকালীন স্পোর্টস নিউট্রিশনিস্টের অভাব অ্যাথলেটদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি করছে, যা দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

সূচক বাংলাদেশ (২০২২-২৩) ভারত (২০২২-২৩) মালয়েশিয়া (২০২২-২৩)
জাতীয় ক্রীড়া বাজেটে স্পোর্টস সায়েন্স/পুষ্টি গবেষণা খাতে বরাদ্দ (%) ০.১% ১.৫% ২.০%
জাতীয় ফেডারেশনগুলোতে পূর্ণকালীন স্পোর্টস নিউট্রিশনিস্টের সংখ্যা ৩ ৩০+ ২৫+
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় গড় পদক সংখ্যা (প্রতি ১০০ অ্যাথলেট) ০.৮ ৭.৫ ৬.০
ক্রীড়া পুষ্টি বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞের সংখ্যা (আনুমানিক) < ১০ ১০০+ ৭৫+

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ; Ministry of Youth Affairs and Sports, India; Ministry of Youth and Sports, Malaysia; World Bank Sports Development Reports.

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'জাতীয় ক্রীড়া পুষ্টি নীতিমালা ২০২৩' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি জাতীয় ফেডারেশনের জন্য একজন করে পূর্ণকালীন ও প্রশিক্ষিত স্পোর্টস নিউট্রিশনিস্ট নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বাজেটে স্পোর্টস সায়েন্স ও পুষ্টি গবেষণা খাতে ন্যূনতম ২% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) নির্দেশক্রমে দেশের অন্তত দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পোর্টস সায়েন্স এবং ক্রীড়া পুষ্টি বিজ্ঞানের উপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চালু করতে হবে, যার জন্য World Bank এবং ADB থেকে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি 'জাতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞান ও গবেষণা ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা অ্যাথলেটদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত পুষ্টি পরিকল্পনা তৈরি, ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট নিয়ে গবেষণা এবং স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পুষ্টি নির্দেশিকা প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আসিফ রায়হান

ড. আসিফ রায়হান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator