গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বেসরকারি বিনিয়োগের অনীহা ও সম্ভাবনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বেসরকারি বিনিয়োগের অনীহা ও সম্ভাবনা

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বেসরকারি বিনিয়োগের অনীহা ও সম্ভাবনা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত: বেসরকারি বিনিয়োগের অনীহা ও সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর ৪৭তম বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-এ দেখা গেছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ...

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর ৪৭তম বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-এ দেখা গেছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত মোট অর্থের একটি সামান্য অংশই বেসরকারি উৎস থেকে আসে, যা দেশের সার্বিক গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের অনীহার এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। যেখানে উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির ২-৪ শতাংশ R&D খাতে ব্যয় হয় এবং এর সিংহভাগ আসে বেসরকারি খাত থেকে, সেখানে বাংলাদেশে এই হার ০.৩ শতাংশের নিচে এবং বেসরকারি খাতের অবদান অত্যন্ত নগণ্য। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা অর্জনে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে, যেখানে শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে অর্থবহ যোগসূত্র স্থাপন অত্যাবশ্যক।

বাংলাদেশের বেসরকারি শিল্প খাত মূলত স্বল্পমেয়াদী মুনাফা এবং আমদানি নির্ভর প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল। স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা, উচ্চ প্রাথমিক ব্যয় এবং অনিশ্চিত প্রতিদান তাদের নিরুৎসাহিত করে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদের অভাবও একটি বড় কারণ। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে, শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী উচ্চতর গবেষণা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। ফলস্বরূপ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যে গবেষণাগুলো হয়, সেগুলোর সঙ্গে শিল্পের চাহিদার প্রায়শই কোনো সম্পর্ক থাকে না। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর আওতাধীন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে মৌলিক গবেষণার সুযোগ সীমিত, যা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করছে। শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন’ মডেলের অনুপস্থিতি এই ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যার ফলে উদ্ভাবনী ধারণাগুলো বাণিজ্যিকীকরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই অনীহা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের R&D খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়। পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাতের মতো দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পগুলোতে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে পণ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ঔষধ শিল্পে স্থানীয়ভাবে নতুন ফর্মুলেশন বা জেনেরিক উৎপাদনে R&D অপরিহার্য। একইভাবে, কৃষি খাতে শস্যের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং উন্নত উৎপাদন পদ্ধতির জন্য গবেষণা প্রয়োজন। স্ট্রেন্থেনিং এমপ্লয়াবিলিটি থ্রু এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (SEIP) প্রকল্পের অধীনে দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ হলেও, R&D-তে সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব পরিলক্ষিত হয়। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে সরকারি R&D ব্যয় বাড়লেও, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব গবেষণা ব্যয় এবং শিল্প খাতের সাথে তাদের যোগসূত্র এখনও দুর্বল। এই খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং নীতিগত প্রণোদনা, যেমন – ট্যাক্স ব্রেক বা ম্যাচিং গ্র্যান্ট, বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে।

খাত মোট R&D ব্যয় (২০২১) বেসরকারি খাতের অবদান (%) সরকারি খাতের অবদান (%)
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩,৫০০ কোটি টাকা ৭% ৯৩%
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২,২০০ কোটি টাকা ২% ৯৮%
বেসরকারি শিল্প ১,১০০ কোটি টাকা ১০০% ০%
মোট জাতীয় R&D ব্যয় ৬,৮০০ কোটি টাকা ~১৬% ~৮৪%

উৎস: বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিবেদন, ২০২২-২৩ (আনুমানিক ডাটা)।

সুপারিশ

  • সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় গবেষণা ও উন্নয়ন নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে R&D-তে বিনিয়োগের জন্য কর অবকাশ (Tax Holiday) এবং ম্যাচিং গ্র্যান্ট (Matching Grant) এর মতো সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নীতিমালা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।
  • ইউজিসি এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সমন্বয়ে 'ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন ফান্ড' গঠন করতে হবে, যা বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়/কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করবে। NSDA-কে এই ফান্ডের অধীনে শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী গবেষণা ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং SEIP-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষ গবেষক তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
  • BANBEIS-এর তত্ত্বাবধানে একটি 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন ডেটা হাব' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে দেশের সকল R&D কার্যক্রম, ফলাফল এবং উদ্ভাবনের তথ্য একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে উপলব্ধ থাকবে। এটি বেসরকারি খাতের জন্য গবেষণার সুযোগ চিহ্নিত করতে এবং গবেষণা ফলাফলের বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা করবে, পাশাপাশি R&D-তে বিনিয়োগের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator