প্যারিস ২০২৪: পদকের দৌড়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, পিছিয়ে বাংলাদেশ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্যারিস ২০২৪: পদকের দৌড়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, পিছিয়ে বাংলাদেশ?

রায়হান রশীদ  avatar   
রায়হান রশীদ
প্যারিস ২০২৪: পদকের দৌড়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, পিছিয়ে বাংলাদেশ?
প্যারিস ২০২৪: পদকের দৌড়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, পিছিয়ে বাংলাদেশ?
ছবি: সংগৃহীত
প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিকে পদকের লড়াইয়ে যখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অ্যাথলেটিক শক্তিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, বায়োমেকানিক্সের সূক্...

প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিকে পদকের লড়াইয়ে যখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অ্যাথলেটিক শক্তিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, বায়োমেকানিক্সের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং অত্যাধুনিক উপকরণের সমন্বয়ে তাদের অ্যাথলেটদের প্রস্তুত করছে, তখন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রযুক্তির এই বৈশ্বিক বিপ্লবের ছোঁয়া এখনও অনেকটাই অধরা। সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস বায়োমেকানিক্স ল্যাবরেটরি তাদের সাঁতারুদের জন্য একটি নতুন 'রিয়েল-টাইম পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিস সিস্টেম' উন্মোচন করেছে, যা অ্যাথলেটদের প্রতিটি স্ট্রোক, গতিপথ এবং শক্তি ব্যয়ের নির্ভুল তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ করে, যা প্যারিসে তাদের পদক জয়ের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের অলিম্পিক প্রস্তুতিতে প্রযুক্তির অনুপস্থিতি একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে।

বিশ্বের অন্যতম ক্রীড়া পরাশক্তি চীন, ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের জন্য তাদের অ্যাথলেটদের প্রস্তুতিতে '৫জি+এআই' প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করছে। তাদের জাতীয় অ্যাথলেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে হাই-স্পিড ক্যামেরা, মোশন সেন্সর এবং এআই-ভিত্তিক ডেটা অ্যানালাইসিস প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করা হয়েছে, যা অ্যাথলেটদের গতিবিধি, শক্তি বিতরণ, এবং কৌশলগত ত্রুটিগুলো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে। এই প্রযুক্তি শুধুমাত্র প্রশিক্ষণের মান উন্নত করছে না, বরং অ্যাথলেটদের শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তা উভয় ক্ষেত্রেই বৈজ্ঞানিক উপায়ে সহায়তা করছে। অন্যদিকে, গ্রেট ব্রিটেন তাদের অ্যাথলেটিক পারফরম্যান্স প্রোগ্রামে 'স্মার্ট টেক্সটাইল' এবং 'সলিড-স্টেট ব্যাটারি' প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে, যা খেলোয়াড়দের পরিধেয় সামগ্রীকে আরও হালকা, আরামদায়ক এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক করে তুলছে। এই প্রযুক্তিগুলো অ্যাথলেটদের ইনজুরি ঝুঁকি কমানো এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই দেশগুলো অলিম্পিক মেডেলের জন্য শুধু শারীরিক শক্তি বা নৈপুণ্যের উপর ভরসা করছে না, বরং প্রযুক্তিকে তাদের প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণের ইতিহাস দীর্ঘ হলেও পদক জয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের অভাব প্রকট। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কিছু সীমিত পরিসরে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেও, বৈশ্বিক মানদণ্ডে তা এখনও অনেক পিছিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, যেখানে উন্নত দেশগুলো অ্যাথলেটদের জন্য কাস্টমাইজড নিউট্রিশন প্ল্যান, জেনোমিক টেস্টিং এবং মানসিক প্রস্তুতির জন্য ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) ব্যবহার করছে, সেখানে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা প্রায়শই পর্যাপ্ত পুষ্টি, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংক (World Bank) যদিও বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা করেছে, কিন্তু ক্রীড়া খাতের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট ও বড় আকারের কোনো প্রকল্প এখনও দৃশ্যমান নয়। এর ফলে, প্যারিস ২০২৪-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হয়তো নিশ্চিত হবে, কিন্তু পদকের দৌড়ে প্রযুক্তির এই বিশাল ব্যবধান অতিক্রম করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশ ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে ব্যবহৃত প্রধান প্রযুক্তি প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিকে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত উন্নতি অলিম্পিক পদক (২০২০ টোকিও)
যুক্তরাষ্ট্র বায়োমেকানিক্যাল ল্যাব, ডেটা অ্যানালিটিক্স, স্পোর্টস সাইকোলজি সফটওয়্যার এআই-চালিত রিয়েল-টাইম পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিস, উন্নত মেটা-ম্যাটেরিয়ালস ১১৩
চীন ৫জি নেটওয়ার্ক, ভিআর সিমুলেশন, এআই কোচিং সিস্টেম এআই-ভিত্তিক ইনজুরি প্রেডিকশন, স্মার্ট টেক্সটাইল, কোয়ান্টাম সেন্সর ৮৮
গ্রেট ব্রিটেন উন্নত এরোডাইনামিক সরঞ্জাম, নিউট্রিশনাল জেনেটিক্স অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগতকৃত ফারমাসিউটিক্যালস ৬৫
বাংলাদেশ প্রাথমিক পর্যায়ের ফিটনেস ট্র্যাকার, সীমিত শারীরিক প্রশিক্ষক নগণ্য (যদি না নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়) ০

উৎস: আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি, বিভিন্ন দেশের জাতীয় অলিম্পিক কমিটি এবং ক্রীড়া বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'জাতীয় ক্রীড়া প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের প্রধান জাতীয় ক্রীড়া একাডেমিগুলোতে (যেমন বিকেএসপি) আন্তর্জাতিক মানের বায়োমেকানিক্যাল ল্যাব ও এআই-চালিত ডেটা অ্যানালাইসিস সেন্টার স্থাপনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'পরিকল্পনা ২০৩০' প্রণয়ন করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর সাথে যৌথভাবে একটি 'ক্রীড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রকল্প' শুরু করতে হবে, যার লক্ষ্য হবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের সাথে স্থানীয় কোচ ও অ্যাথলেটদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়ের জন্য একটি বার্ষিক ফেলোশিপ প্রোগ্রাম চালু করা এবং ২০২২ সালের যুব ও ক্রীড়া আইন সংশোধন করে প্রযুক্তিনির্ভর ক্রীড়া গবেষণাকে উৎসাহিত করা।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে (NSC) দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করতে হবে, যাতে স্থানীয় প্রযুক্তিবিদরা অলিম্পিক অ্যাথলেটদের জন্য কাস্টমাইজড সফটওয়্যার, ভিআর/এআর প্রশিক্ষণ মডিউল এবং স্মার্ট সেন্সর তৈরি করতে পারে, এবং প্রতি বছর অন্তত তিনটি উদ্ভাবনী ক্রীড়া প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রায়হান রশীদ

রায়হান রশীদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator