কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শ্রম আইনের ফাঁকফোকর: দায় কার? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শ্রম আইনের ফাঁকফোকর: দায় কার?

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শ্রম আইনের ফাঁকফোকর: দায় কার?
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শ্রম আইনের ফাঁকফোকর: দায় কার?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের কর্মজীবী ​​জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৫% গ...

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের কর্মজীবী ​​জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৫% গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং বার্নআউট অন্যতম। এই সমীক্ষা আরও দেখায় যে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের অনিশ্চয়তা এবং হয়রানি এই সমস্যাগুলির প্রধান অনুঘটক। অথচ বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালায় কর্মক্ষেত্রে শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত বিধান থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। বিশেষ করে, মানসিক স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা, কর্মক্ষেত্রে এর প্রভাব নিরূপণ বা সুরক্ষা প্রদানে নিয়োগকর্তার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এই আইনি শূন্যতা শুধু কর্মীদের মৌলিক অধিকারকেই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা এবং জনস্বাস্থ্যের উপরও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের শ্রম আইনে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ধারাগুলি মূলত শারীরিক ঝুঁকি এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপরই কেন্দ্রীভূত। ধারা ৪৮ থেকে ধারা ৮০ পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মস্থলে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি, চিকিৎসা সুবিধা এবং বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বিধিমালা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ধারা ৪৯ (১) অনুযায়ী, প্রতিটি কর্মস্থলে পর্যাপ্ত আলো, বায়ুচলাচল এবং পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ধারা ৫১ অনুযায়ী, বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুবিধা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে, এই আইন সম্পূর্ণ নীরব। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, হয়রানি (বিশেষ করে মনোস্তাত্ত্বিক হয়রানি বা মববিং), কাজের অতিরিক্ত চাপ, বা কর্মপরিবেশের কারণে সৃষ্ট মানসিক অসুস্থতাকে পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো আইনি কাঠামো অনুপস্থিত। এর ফলে, একজন কর্মী কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপের কারণে গুরুতর অসুস্থ হলেও, তিনি শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার দাবি করতে পারেন না, যা শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে সম্ভব। এই আইনি অস্পষ্টতা নিয়োগকর্তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব পালনে উদাসীন করে তুলছে এবং কর্মীদের জন্য একটি অনিরাপদ মানসিক কর্মপরিবেশ তৈরি করছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি, ২০২২ প্রণয়ন করেছে। এই নীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এর ব্যাপক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে, এই নীতিতে কর্মক্ষেত্রের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা বা প্রয়োগযোগ্য ব্যবস্থার বিস্তারিত উল্লেখ নেই। নীতিটি মূলত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের প্রশিক্ষণের উপর জোর দেয়। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োগকর্তার ভূমিকা, মানসিক অসুস্থতার কারণে কর্মীর অধিকার, বা কর্মক্ষেত্রে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায়, নীতিটি কার্যক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সম্মুখীন হচ্ছে। উপরন্তু, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা করলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর তাদের সুনির্দিষ্ট এবং নিয়মিত সমীক্ষা বা ডাটাবেসের অভাব রয়েছে, যা এই সমস্যাটির প্রকৃত ব্যাপ্তি এবং কারণগুলি অনুধাবনে বাধা সৃষ্টি করছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ ও মান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখলেও, কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ কমাতে বা প্রতিরোধে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই।

মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা কর্মজীবী জনগোষ্ঠীতে প্রকোপ (%) শ্রম আইনে উল্লেখ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতিতে উল্লেখ
বিষণ্ণতা (Depression) ৭.৫% নেই বিস্তৃতভাবে উল্লেখ আছে
উদ্বেগ (Anxiety) ৪.৮% নেই বিস্তৃতভাবে উল্লেখ আছে
বার্নআউট (Burnout) ২.২% নেই পরোক্ষভাবে উল্লেখ আছে
কর্মক্ষেত্রে হয়রানি (Workplace Harassment - Psychological) ১৪.০% নেই (শারীরিক হয়রানি আংশিক) নেই

উৎস: NIMH ও WHO এর যৌথ সমীক্ষা (২০২১-২০২২) এবং বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি, ২০২২ এর পর্যালোচনা।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬-এ সুস্পষ্টভাবে মানসিক স্বাস্থ্যকে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে 'কর্মক্ষেত্রে মানসিক হয়রানি', 'কাজের চাপজনিত অসুস্থতা' এবং 'বার্নআউট'কে পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে শ্রম আইনের ধারা ৪৯, ৫১ এবং ৮০ এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিধান যুক্ত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি, ২০২২-এর অধীনে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা (Action Plan) তৈরি করতে হবে, যেখানে নিয়োগকর্তাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি (যেমন: কাউন্সেলিং সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ) বাধ্যতামূলক করার বিধান থাকবে এবং NIMH ও DGHS-কে এই কর্মসূচিগুলির বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব দিতে হবে।
  • DGHS এবং IEDCR-কে যৌথভাবে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নিয়মিত, দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনা এবং একটি জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করতে হবে, যা কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকোপ, কারণ এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করবে এবং ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণ ও আইন সংশোধনে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator