নেপথ্যের চাবি: গ্লোবাল স্কলারশিপের আড়ালে ব্রেইন ড্রেন না ব্রেইন গেইন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নেপথ্যের চাবি: গ্লোবাল স্কলারশিপের আড়ালে ব্রেইন ড্রেন না ব্রেইন গেইন?

সাবরিনা চৌধুরী  avatar   
সাবরিনা চৌধুরী
নেপথ্যের চাবি: গ্লোবাল স্কলারশিপের আড়ালে ব্রেইন ড্রেন না ব্রেইন গেইন?
নেপথ্যের চাবি: গ্লোবাল স্কলারশিপের আড়ালে ব্রেইন ড্রেন না ব্রেইন গেইন?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীর ...

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে, যা প্রতি বছর প্রায় ৭০,০০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন বৈশ্বিক বৃত্তি প্রকল্পের আওতায় উন্নত দেশগুলোতে যাচ্ছে। এই ধারা একদিকে যেমন দেশের তরুণ প্রজন্মের বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহের প্রতিচ্ছবি, তেমনই অন্যদিকে দেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এক গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে: এটি কি কেবলই মেধা পাচার (ব্রেইন ড্রেন), নাকি ভবিষ্যতের জন্য এক সুদূরপ্রসারী মেধা অর্জন (ব্রেইন গেইন)-এর সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে?

বৈশ্বিক বৃত্তিগুলো নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এক অসাধারণ সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে। উন্নত বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক গবেষণা সুবিধা, বিশ্বমানের শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং তুলনামূলক ভালো কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা শিক্ষার্থীদের বিদেশে যেতে উৎসাহিত করছে। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড বা এমআইটি-এর মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের পরিমাপক নয়, বরং দেশের জন্য আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও দক্ষতার প্রসারেরও একটি মাধ্যম। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৌশল, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মৌলিক বিজ্ঞান—এই চারটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার হার সর্বাধিক। এই বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা যখন উন্নত প্রযুক্তি ও জ্ঞান নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান, তখন তারা এমন এক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন যা দেশের সীমিত গবেষণা ও উন্নয়ন পরিবেশে প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে।

তবে, এই উজ্জ্বল চিত্রের আড়ালে একটি গভীর উদ্বেগও বিদ্যমান। বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই দেশে ফিরে আসেন না। উন্নত জীবনযাত্রা, গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ এবং আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো তাদের সেখানেই স্থায়ী হতে প্ররোচিত করে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে সেখানেই থেকে যান। এর ফলে দেশের মেধাবী তরুণদের একটি অংশ দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই মেধা পাচার শুধুমাত্র মানবসম্পদের ক্ষতি নয়, বরং তাদের পেছনে ব্যয়িত রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক বিনিয়োগেরও অপচয়। তবে, এই 'ব্রেইন ড্রেন'-কে 'ব্রেইন সার্কুলেশন'-এ পরিণত করার সুযোগও রয়েছে, যেখানে প্রবাসীরা তাদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারেন, এমনকি দূর থেকেও।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনা বা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর জন্য একটি সুচিন্তিত কৌশল অপরিহার্য। এই 'ব্রেইন গেইন' তখনই সম্ভব যখন আমরা প্রবাসীদের জন্য দেশে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারব। এর মধ্যে রয়েছে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল, আধুনিক অবকাঠামো, প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ। বিশেষ করে, ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে যেখানে প্রবাসীরা তাদের জ্ঞান স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতে স্থানান্তর করতে পারেন। এটি কেবল নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন আনবে না, বরং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা ও পরামর্শেরও উৎস হবে। একটি শক্তিশালী 'ডায়াস্পোরা এনগেজমেন্ট পলিসি' এই সম্ভাবনাকে আরও বাস্তব করে তুলতে পারে, যেখানে প্রবাসীদের বিনিয়োগ, পরামর্শ এবং নেটওয়ার্কিং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

সাল বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা শীর্ষ ৩ গন্তব্য দেশ ফিরে আসা শিক্ষার্থীর সম্ভাব্য হার (%) গবেষণায় ব্যয় (জিডিপি-এর % হিসাবে)
২০১৮-১৯ ৩৮,৭০০ ইউএসএ, ইউকে, কানাডা ৩০% ০.১৫%
২০১৯-২০ ৪৫,৫০০ ইউএসএ, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া ২৮% ০.১৪%
২০২০-২১ ৫০,১০০ ইউএসএ, কানাডা, জার্মানি ২৫% ০.১৫%
২০২১-২২ ৬২,৩০০ ইউএসএ, ইউকে, কানাডা ২৩% ০.১৬%
২০২২-২৩ ৭১,২০০ ইউএসএ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ২২% ০.১৭%

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন, ব্যানবেইস শিক্ষা পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংস্থা।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি-কে যৌথভাবে 'রিটার্নিং স্কলারস ইনসেনটিভ প্রোগ্রাম' চালু করতে হবে, যেখানে বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প খাতে বিশেষ পদ, গবেষণা অনুদান এবং ট্যাক্স সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
  • ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ)-কে একটি 'ডায়াস্পোরা স্কিলস ম্যাপিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পোর্টাল' তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে বিদেশে অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দেশের সুনির্দিষ্ট শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে আধুনিক প্রযুক্তি এবং শিল্পের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে কারিকুলাম সংস্কারের জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে এবং এর বাস্তবায়নে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত অংশগ্রহণের জন্য একটি কাঠামোবদ্ধ 'টেকনিক্যাল নলেজ ট্রান্সফার ফোরাম' গঠন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাবরিনা চৌধুরী

সাবরিনা চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator