সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও, ডিজিটাল দক্ষতাভিত্তিক বিশেষায়িত কোর্সগুলোতে তাদের উপস্থিতি এখনো পুরুষ শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশ পিছিয়ে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিষয়ে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এই পরিসংখ্যান কেবল শিক্ষাঙ্গনের চিত্র নয়, এটি ই-কমার্স খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সুপ্ত ডিজিটাল বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়, যা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
ডিজিটাল যুগে ই-কমার্স একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হলেও, এর পূর্ণ সুফল নারী উদ্যোক্তারা এখনো ঘরে তুলতে পারছেন না। এর মূল কারণ নিহিত রয়েছে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করলেও, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, ডিজিটাল মার্কেটিং কৌশল, সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থাপনার মতো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নারীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি সুস্পষ্ট। ফলস্বরূপ, অনেক সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে তাদের পণ্য ও সেবাকে বৃহত্তর ডিজিটাল বাজারে পৌঁছাতে পারছেন না, যা তাদের ব্যবসার পরিধিকে সীমিত করে রাখছে। এই পরিস্থিতি গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের জন্য আরও প্রকট, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ উভয়ই সীমিত।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে ই-কমার্স-কেন্দ্রিক ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষায়িত পাঠ্যক্রমের অভাব এখনো বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যমান অনেক কোর্সে সাধারণ কম্পিউটার লিটারেসি শেখানো হলেও, একটি অনলাইন স্টোর সেটআপ করা, পণ্যের ডিজিটাল ফটোগ্রাফি, এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন), অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বাজারজাতকরণের মতো ব্যবহারিক দিকগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। SEIP (Skills for Employment Investment Program)-এর মতো প্রকল্পগুলো প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করলেও, সেগুলোর প্রচার ও প্রসারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এই ব্যবধান নারী উদ্যোক্তাদের শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখছে না, বরং ডিজিটাল অর্থনীতিতে তাদের সামগ্রিক অবদানকেও খর্ব করছে।
| সূচক | ২০১৮ | ২০২১ | ২০২৩ |
|---|---|---|---|
| উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর হার (শতাংশ) | ৩৭.৫% | ৪০.২% | ৪১.৮% |
| প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর হার (শতাংশ) | ১৮.২% | ২১.৫% | ২৪.১% |
| ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণে নারী অংশগ্রহণকারীর হার (শতাংশ) | ৭.০% | ৯.৫% | ১১.২% |
উৎস: UGC, BANBEIS, NSDA বার্ষিক প্রতিবেদন
সুপারিশ
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও UGC-এর যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিকগুলোতে ই-কমার্স ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা হোক, যেখানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের উপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং SEIP প্রকল্পের অধীনে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য 'ই-কমার্স বুটক্যাম্প' এবং 'ডিজিটাল লিডারশিপ প্রোগ্রাম' ডিজাইন করা হোক, যা গ্রামীণ ও শহর উভয় অঞ্চলের নারীদের জন্য সহজে অ্যাক্সেসযোগ্য হবে এবং সফল ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের মেন্টরশিপ অন্তর্ভুক্ত করবে।
- BANBEIS-এর মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেই কারিগরি শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ই-কমার্স ও ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের প্রাথমিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যাতে তরুণী শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে ডিজিটাল উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য শুরু থেকেই প্রস্তুত হতে পারে।