অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা: খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কতটা সফল? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা: খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কতটা সফল?

অ্যাডভোকেট সাব্বির  avatar   
অ্যাডভোকেট সাব্বির
অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা: খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কতটা সফল?
অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা: খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কতটা সফল?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৩ ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১০.৯৯ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM) এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের হার এখনো অত্যন্ত কম, বিশেষ করে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই হার হতাশাজনক। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ (সংশোধিত ২০০৩, ২০১০, ২০১৫) এর মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে খেলাপি ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করা। তবে, প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই আইন কার্যকর থাকার পরেও, খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থঋণ আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে একটি প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালতের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু নিষ্পত্তির হার তুলনামূলকভাবে কম। অনেক ক্ষেত্রে, ঋণগ্রহীতারা অর্থঋণ আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করছেন, যা বিচার প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। এছাড়াও, আদালতের বিচারক স্বল্পতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবও এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণ। বিশেষ করে, সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ খেলাপির মামলার সম্মুখীন হয়, যা তাদের পক্ষে দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। BIBM এর গবেষণা অনুযায়ী, মামলার খরচ, আইনগত জটিলতা এবং ঋণগ্রহীতার পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃত কালক্ষেপণের কৌশল প্রায়শই ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, কারণ ব্যাংকগুলো তাদের মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহ করতে পারছে না।

খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা মূল্যায়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আদালতের রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন। অনেক ক্ষেত্রে, আদালত রায় দিলেও, সেই রায় অনুযায়ী বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রি বা ঋণ আদায় প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা যায় না। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, নিলাম প্রক্রিয়ায় ক্রেতার অভাব, সম্পত্তির ন্যায্য মূল্য নির্ধারণে জটিলতা এবং কখনো কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাংকগুলো সাধারণত উচ্চ মূল্যের বন্ধকী সম্পত্তি ব্যবহার করে ঋণ দেয়, কিন্তু খেলাপি হওয়ার পর সেই সম্পত্তির বাজার মূল্য বা আইনি জটিলতার কারণে তা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলীকরণ নীতিমালার শিথিলতাও অর্থঋণ আদালতের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক খেলাপি ঋণগ্রহীতা আদালতের মুখোমুখি হওয়ার বদলে বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ নিচ্ছেন, যা অর্থঋণ আদালতের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। এর ফলে, অর্থঋণ আদালতগুলো শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে পড়ছে, যা খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

সাল মোট খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা) মোট ঋণের শতাংশ অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলা (সংখ্যা) অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে আদায় (কোটি টাকা)
২০২১ ১,০৩,২৭৪ ৮.৯৯% ৭০,৭৬৯ ৩,৭৮০
২০২২ ১,২০,৬৫৮ ৯.১৬% ৭২,৩৩৪ ৪,০১২
২০২৩ (সেপ্টেম্বর) ১,৭৩,৪০০ ১০.৯৯% ৭৪,৫১১ ৪,৪৫০ (আনুমানিক)

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও BIBM গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ধারা ১৯(৩) অনুযায়ী, মামলার সময়সীমা ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও তা কার্যকর হয় না। এই ধারাটি কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য বিচারকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং বিচারক ও সহায়ক জনবল বৃদ্ধিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালায় খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা এবং পুনর্গঠন/পুনঃতফসিলীকরণের শর্তাবলী আরও কঠোর করতে হবে, যাতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা বারবার সুযোগ নিয়ে অর্থঋণ আদালতের প্রক্রিয়াকে পাশ কাটাতে না পারে।
  • আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কর্তৃক অর্থঋণ আদালতের রায়ের দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যা নিলাম প্রক্রিয়া এবং বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির জটিলতা নিরসনে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করবে এবং প্রয়োজনে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ আইনি সহায়তা প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট সাব্বির

অ্যাডভোকেট সাব্বির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator