জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চ্যালেঞ্জ

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চ্যালেঞ্জ
জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ: পরিবেশবান্ধব পুনর্প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত 'জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ পুনর্প্রক্রিয়াকরণ শিল্প (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০২২'-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং এর অধীনে গ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত 'জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ পুনর্প্রক্রিয়াকরণ শিল্প (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০২২'-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং এর অধীনে গঠিত নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম শুরু হওয়া, দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিশেষ করে হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস (হংকং কনভেনশন)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায়, শিল্পটির পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস ও শ্রমিক সুরক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। যদিও এই পদক্ষেপ একটি ইতিবাচক সূচনা, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প বহু দশক ধরে দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের একটি প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে। World Bank-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইস্পাতের চাহিদার প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ পূরণ হয় এই শিল্প থেকে প্রাপ্ত স্ক্র্যাপ মেটাল দ্বারা। তবে, এই শিল্প দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ এবং শ্রমিকদের অনিরাপদ কর্মপরিবেশের জন্য সমালোচিত। বিশেষ করে, বিষাক্ত বর্জ্য যেমন অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs), হেভি মেটাল এবং তেল সমুদ্রে ও মাটিতে মিশে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে আসছিল। নতুন আইনের অধীনে, জাহাজ ভাঙার আগে ক্ষতিকারক পদার্থের ইনভেন্টরি (IHM) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা হংকং কনভেনশনের অন্যতম প্রধান শর্ত। এই IHM অনুযায়ী, প্রতিটি জাহাজকে ভাঙার আগে তার সমস্ত বিপজ্জনক উপাদান চিহ্নিত ও সরিয়ে ফেলতে হবে। এর ফলে, পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব কমানো সম্ভব হবে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার পথ সুগম হবে। এছাড়া, শ্রমিকদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) এবং প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার হার কমাতে সহায়ক হবে।

আন্তর্জাতিকভাবে, জাহাজ ভাঙা শিল্পের পরিবেশবান্ধব পুনর্প্রক্রিয়াকরণ একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য উন্নত প্রযুক্তি এবং কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে সবুজ জাহাজ ভাঙা প্রক্রিয়া প্রচলনের জন্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। বাংলাদেশে, এই শিল্পকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে হলে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। বর্তমানে, দেশের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোর একটি বড় অংশ এখনও আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবে ভুগছে। হংকং কনভেনশনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও ratify করার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে এর জন্য ইয়ার্ডগুলোকে স্লিপওয়ে, কন্টেইনমেন্ট এরিয়া, বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট এবং চিকিৎসা সুবিধা সহ উন্নত করতে হবে। এই উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ইয়ার্ডগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে সবুজ জাহাজ ভাঙা সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই।

নিম্নে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরা হলো:

সূচক ২০১০ ২০১৫ ২০২০ ২০২২
মোট ভাঙা জাহাজের সংখ্যা ২২০ ২৬০ ১৮৫ ২৩৫
পুনর্ব্যবহৃত স্ক্র্যাপের পরিমাণ (মিলিয়ন টন) ১.২ ১.৫ ১.০ ১.৪
শ্রমিক দুর্ঘটনা (প্রতি ১০০০ শ্রমিক) ৮.৫ ৬.০ ৪.২ ৩.৫
হংকং কনভেনশন কমপ্লায়েন্ট ইয়ার্ডের সংখ্যা ০ ২ ১৫ ২৩

উৎস: বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয়, শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন, World Bank

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে 'জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ পুনর্প্রক্রিয়াকরণ শিল্প (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০২২'-এর অধীনে গঠিত নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রতিটি ইয়ার্ডে হংকং কনভেনশনের শর্তাবলী, বিশেষ করে IHM বাস্তবায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে সবুজ জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিনিয়োগের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ এবং প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে, যা ইয়ার্ড মালিকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে উৎসাহিত করবে এবং World Bank ও ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা লাভে সহায়ক হবে।
  • শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে 'বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬' এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা রোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator