নির্বাচনী ট্রাস্ট সংকট: ভোটারবিহীন কেন্দ্রে স্বচ্ছতার ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি

নির্বাচনী ট্রাস্ট সংকট: ভোটারবিহীন কেন্দ্রে স্বচ্ছতার ভবিষ্যৎ

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
নির্বাচনী ট্রাস্ট সংকট: ভোটারবিহীন কেন্দ্রে স্বচ্ছতার ভবিষ্যৎ
নির্বাচনী ট্রাস্ট সংকট: ভোটারবিহীন কেন্দ্রে স্বচ্ছতার ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উপনির্বাচনে ৪৭.৫২% ভোটার উপস্থিতির পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার...

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উপনির্বাচনে ৪৭.৫২% ভোটার উপস্থিতির পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত এই তথ্য, যা পূর্ববর্তী জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও, ভোটারবিহীন কেন্দ্রের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং সার্বিকভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের পরও এই ধরনের পরিস্থিতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই নয়, সাধারণ নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে প্রশ্ন উঠছে – একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা কতটা জরুরি এবং এর জন্য কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং ভোটারদের আস্থাহীনতা কেবল ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিতি হিসেবেই প্রতিফলিত হয় না, এটি সামগ্রিকভাবে সুশাসন এবং জবাবদিহিতার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। বিগত দশকে বাংলাদেশের কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর World Bank এবং Asian Development Bank (ADB)-এর মতো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণকেও প্রভাবিত করেছে। World Bank-এর 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) রিপোর্টে 'Voice and Accountability' এবং 'Government Effectiveness' সূচকগুলোতে বাংলাদেশের স্কোর স্থিতিশীল না থেকে বরং কিছু ক্ষেত্রে অবনতির ইঙ্গিত দিয়েছে, যা সরাসরি নির্বাচনী ট্রাস্টের সাথে সম্পর্কিত। এই সূচকগুলো দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন একটি দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব প্রকট হয়, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দিহান হন, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলস্বরূপ, ADB-এর মতো সংস্থাগুলো কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ বা অনুদানের শর্তাবলীতে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হয়, যা দেশের উন্নয়ন এজেন্ডাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট নিরসনে প্রযুক্তির ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হতে পারে, তবে কেবল ইভিএমের ব্যবহারই চূড়ান্ত সমাধান নয়। ইভিএমের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এর কারিগরি দিক, যেমন – সোর্স কোডের উন্মুক্ততা, নিয়মিত অডিট এবং ভোটার ভেরিফাইড পেপার অডিট ট্রেইল (VVPAT) এর মতো সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, নির্বাচনী আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা এবং নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী সংস্কারের কথা বলা হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রায়শই ধীরগতিতে হয়েছে অথবা বিতর্কিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন, ২০০৯ এর মাধ্যমে কমিশনকে প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলেও, এর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন বিদ্যমান। এছাড়া, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা না গেলে, কেবল আইন প্রণয়ন করে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একটি কার্যকর নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য শুধু আইন ও প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সকল স্টেকহোল্ডারের অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ।

নির্বাচন/বছর মোট ভোটার ভোট দিয়েছে (সংখ্যা) ভোটের হার (%) মন্তব্য
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন উপনির্বাচন, ২০১৯ ৩০,৩৪,৫১৭ ১৪,৪৩,৫৬৭ ৪৭.৫২% ইভিএম ব্যবহার, প্রধান বিরোধী দলের বর্জন
১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৮ ১০,৪১,৯০,৫৯৭ ৮,১২,৪৩,৩৪৩ ৮০.২০% ভোটের হার নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক
১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৪ ৯,১৯,৬৫,৯৮৬ ৪,২৭,৯১,৫৮১ ৫১.০০% প্রধান বিরোধী দলের বর্জন, ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়
৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০০৮ ৮,১০,৮৭,৫৬১ ৭,০০,৬৩,৫১২ ৮৭.১৩% তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত

উৎস: নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, বাংলাদেশ

সুপারিশ

  • নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) আর্থিক ও প্রশাসনিক উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে, যার জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন, ২০০৯-এর প্রয়োজনীয় ধারাগুলো সংশোধন করে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি সংসদ থেকে অর্থপ্রাপ্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
  • নির্বাচনী আইনে (যেমন: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২) ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সোর্স কোডের উন্মুক্ততা, তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা এবং প্রতিটি ভোটের জন্য ভোটার ভেরিফাইড পেপার অডিট ট্রেইল (VVPAT) বাধ্যতামূলক করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দিতে হবে।
  • নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করে নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিলের ব্যবস্থা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator