ব্লু ফ্ল্যাগ প্রত্যাশা: কক্সবাজারের সৈকতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অগ্নিপরীক্ষা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ব্লু ফ্ল্যাগ প্রত্যাশা: কক্সবাজারের সৈকতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অগ্নিপরীক্ষা

মেহেদী পারভেজ  avatar   
মেহেদী পারভেজ
ব্লু ফ্ল্যাগ প্রত্যাশা: কক্সবাজারের সৈকতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অগ্নিপরীক্ষা
ব্লু ফ্ল্যাগ প্রত্যাশা: কক্সবাজারের সৈকতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অগ্নিপরীক্ষা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্ট ও সুগন্ধা পয়েন্টকে আন্তর্জাতিক 'ব্লু ফ্ল্যাগ' সার্টিফিকেশনের জন্য প্রাথমিকভাবে...

সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্ট ও সুগন্ধা পয়েন্টকে আন্তর্জাতিক 'ব্লু ফ্ল্যাগ' সার্টিফিকেশনের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করার পর থেকেই সৈকতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই সার্টিফিকেশন অর্জনের জন্য বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা অপরিহার্য, যা বর্তমানে বিদ্যমান অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষত, দৈনিক উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্যের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি এবং পর্যটকদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি না করতে পারলে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ব্লু ফ্ল্যাগ কর্মসূচির কঠোর মানদণ্ডের মধ্যে অন্যতম হলো সৈকত এবং সংলগ্ন এলাকার বর্জ্য অপসারণ ও পুনর্ব্যবহারের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা। কক্সবাজার পৌরসভা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পিক সিজনে প্রতিদিন প্রায় ৩০০-৪০০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপরিকল্পিতভাবে সৈকতের কাছাকাছি বা ড্রেনেজ সিস্টেমে ফেলে দেওয়া হয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কর্তৃক ২০১৯ সালে প্রকাশিত 'Waste Management in Bangladesh: A Deep Dive' শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের উপকূলীয় শহরগুলিতে বর্জ্য সংগ্রহের হার মাত্র ৪০-৫০% এবং সংগৃহীত বর্জ্যের মাত্র ৫-১০% পুনর্ব্যবহার করা হয়। এই চিত্র ব্লু ফ্ল্যাগ সার্টিফিকেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ১০০% বর্জ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক নিষ্পত্তির লক্ষ্য থেকে বহুদূর। বিশেষ করে, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পচনশীল জৈব বর্জ্য মিশ্রিত হওয়ায় এর প্রক্রিয়াকরণ আরও জটিল হয়ে পড়ে, যা সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি।

ব্লু ফ্ল্যাগ অর্জনের জন্য কেবল বর্জ্য সংগ্রহই নয়, বরং বর্জ্য পৃথকীকরণ (যেমন: প্লাস্টিক, কাঁচ, জৈব বর্জ্য), রিসাইক্লিং সুবিধা এবং বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের মতো আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের 'Coastal Tourism Development Project' এর আওতায় কক্সবাজারে কিছু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অর্থায়ন করলেও, এর বাস্তবায়ন গতি এবং পরিধি এখনও ব্লু ফ্ল্যাগের মানদণ্ড পূরণে যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বর্জ্য ফেলার স্থান, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন অনুশীলনের অভাব সৈকতের পরিবেশকে প্রতিনিয়ত অবনমিত করছে। উপরন্তু, স্থানীয় হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতাও একটি বড় সমস্যা, যেখানে প্রায়শই তারা নিজস্ব বর্জ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়া না করে সাধারণ ড্রেন বা নিচু এলাকায় ফেলে দেয়, যা বর্ষাকালে সমুদ্রের পানিতে মিশে সৈকতের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্যবিধি নষ্ট করে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সূচক জাতীয় গড় (২০২৩) কক্সবাজারের অনুমান (২০২৩) ব্লু ফ্ল্যাগ মানদণ্ড
দৈনিক কঠিন বর্জ্য উৎপাদন (টন) ০.৬ কেজি/জন/দিন (শহর) ৩৫০-৪০০ (পিক সিজন) স্বচ্ছ বর্জ্য উৎপাদন নীতি
বর্জ্য সংগ্রহ হার ৫৫% ৬০% ১০০%
বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হার ১০% ৫% ন্যূনতম ৫০% (নির্দিষ্ট বর্জ্য)
স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সুবিধা ১০% শহর আংশিক বিদ্যমান ১০০% বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

উৎস: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (Waste Management Assessment, 2019), ADB (Coastal Tourism Development Project Reports)

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং কক্সবাজার পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনকে এই বিধিমালার অধীনে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বাধ্য করা।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক/এডিবি-এর আর্থিক সহায়তায় কক্সবাজারে আধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন (Waste-to-Energy) প্ল্যান্ট স্থাপন করা, যা 'জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি, ২০১০' এর সাথে সংগতিপূর্ণ এবং ব্লু ফ্ল্যাগের কারিগরি মানদণ্ড পূরণ করে।
  • পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় ট্যুরিজম বোর্ডকে যৌথভাবে 'পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতিমালা' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, যেখানে পর্যটকদের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকা, পরিবেশ সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং হোটেল-মোটেলগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক বর্জ্য অডিট ও পরিবেশগত ছাড়পত্র শর্তাধীন করার বিধান থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মেহেদী পারভেজ

মেহেদী পারভেজ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লু ফ্ল্যাগ সমুদ্র সৈকত ও পর্যটন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator