ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও তথ্যের গোপনীয়তা: নাগরিকের অধিকার বনাম রাষ্ট্রের নজরদারি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও তথ্যের গোপনীয়তা: নাগরিকের অধিকার বনাম রাষ্ট্রের নজরদারি

অ্যাডভোকেট ফারজানা  avatar   
অ্যাডভোকেট ফারজানা
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও তথ্যের গোপনীয়তা: নাগরিকের অধিকার বনাম রাষ্ট্রের নজরদারি
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও তথ্যের গোপনীয়তা: নাগরিকের অধিকার বনাম রাষ্ট্রের নজরদারি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে (ডিএসএ) দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা ১৯ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর, বিশেষ করে সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধি...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে (ডিএসএ) দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা ১৯ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর, বিশেষ করে সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে এর ব্যাপক প্রয়োগ, বাংলাদেশের তথ্য অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এই বিপুল সংখ্যক মামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশের অভিযোগে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, সাইবার অপরাধ দমনের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রণীত এই আইনটি প্রায়শই নাগরিকের মৌলিক অধিকার, বিশেষত তথ্যের গোপনীয়তা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় নজরদারির বিস্তৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (ডিএসএ) প্রণয়নের মূল লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ যেমন সাইবার প্রতারণা, হ্যাকিং, পর্নোগ্রাফি এবং ডিজিটাল সন্ত্রাস দমন করা। এই আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এর কিছু ধারা, যেমন ২৫ (মানহানি), ২৮ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত), ২৯ (মানহানি) এবং ৩১ (আইনশৃঙ্খলার অবনতি) ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। এর কারণ হলো, এই ধারাগুলোর সংজ্ঞা অত্যন্ত ব্যাপক ও অস্পষ্ট, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করে এবং এর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, 'মানহানি' বা 'আইনশৃঙ্খলার অবনতির' মতো বিষয়গুলোকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কিভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা নিয়ে প্রায়শই বিতর্ক দেখা দেয়, যা ভিন্নমত দমন এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করার একটি সহজ পথ খুলে দেয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বারবার এই ধারাগুলো সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন, তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়, যা নাগরিকের তথ্যের গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

নাগরিকের তথ্যের গোপনীয়তা এবং রাষ্ট্রের নজরদারির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশকে, কোনো পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে বিবেচিত। এই ক্ষমতা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং তথ্যের গোপনীয়তার অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ডিজিটাল সুশাসন (Digital Governance) এবং তথ্যের সুরক্ষার উপর জোর দিলেও, ডিএসএ-এর বর্তমান কাঠামো এসব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই আইনটি তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে আস্থা তৈরির পরিবর্তে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে, যেখানে নাগরিকরা তাদের ডিজিটাল পদচিহ্ন এবং অনলাইন কার্যকলাপ সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও এক ধরনের স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ তৈরি করছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিতার দুর্বলতা এর অপব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই আইনের অধীনে মামলা দায়েরের আগে যথাযথ তদন্ত বা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয় না। ফলে বহু নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের মূল্যবান সময় ও সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার যদিও সাইবার অপরাধ দমনে সচেষ্ট, তবে এই আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো নিয়ে পুনর্বিবেচনা না করায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশীয় সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ব্যাপক সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ এতটাই গভীর যে, এর বিকল্প হিসেবে একটি নতুন আইন প্রণয়নের কথাও বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এসেছে, যা নাগরিক অধিকারের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। এই টেবিলটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত মামলার একটি চিত্র তুলে ধরে:

বছর মোট মামলার সংখ্যা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা
২০১৮ ৭২১ ১০ ৫
২০১৯ ১১৭৯ ১৯ ৮
২০২০ ২১৯৮ ২৩ ১২
২০২১ ৪৩৫৭ ৩৫ ১৫
২০২২ ৫৮৭৯ ৪৯ ২০
২০২৩ (প্রথমার্ধ) ৪৬৭৫ ৩০ ১২
মোট (২০১৮-২০২৩ প্রথমার্ধ) ১৯,৬২৯ ১৬৬ ৭২

উৎস: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারা ২৫, ২৮, ২৯, ও ৩১ অবিলম্বে সংশোধন করে বা বাতিল করে, এর পরিবর্তে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি নতুন সাইবার আইন প্রণয়ন করা হোক, যা সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করবে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
  • আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করুক যাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের পূর্বে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই এবং তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়, যা অপব্যবহার রোধ করবে এবং কেবলমাত্র গুরুতর সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার কার্যালয় (OHCHR) এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর ডিজিটাল সুশাসন সংক্রান্ত সুপারিশমালা অনুসরণ করে একটি কার্যকর ডেটা সুরক্ষা আইন (Data Protection Act) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করুক, যা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করবে এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির সীমা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট ফারজানা

অ্যাডভোকেট ফারজানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator