আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে বাংলাদেশি সিনেমার অর্থায়ন সংকট: ফেস্টিভ্যাল নাকি স্ট্রিমিং? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে বাংলাদেশি সিনেমার অর্থায়ন সংকট: ফেস্টিভ্যাল নাকি স্ট্রিমিং?

ফারদিন খান  avatar   
ফারদিন খান
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে বাংলাদেশি সিনেমার অর্থায়ন সংকট: ফেস্টিভ্যাল নাকি স্ট্রিমিং?
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে বাংলাদেশি সিনেমার অর্থায়ন সংকট: ফেস্টিভ্যাল নাকি স্ট্রিমিং?
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের 'মার্শে দ্যু ফিল্ম' বা ফিল্ম মার্কেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী মাত্র দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রজেক্টের উপস্থিতি এবং সে...

২০২৩ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের 'মার্শে দ্যু ফিল্ম' বা ফিল্ম মার্কেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী মাত্র দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রজেক্টের উপস্থিতি এবং সেগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা ও পরিবেশনা খুঁজে পেতে প্রাথমিক ব্যর্থতা আবারও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের দীর্ঘদিনের অর্থায়ন সংকটকে সামনে এনেছে। একই সময়ে, বৈশ্বিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশি কন্টেন্টের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও, এর সিংহভাগই দেশীয় প্ল্যাটফর্ম বা অ-প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে, বাংলাদেশের সিনেমার জন্য পর্যাপ্ত ও টেকসই অর্থায়নের অভাব স্পষ্ট। এমনকি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত অনুদানও প্রায়শই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব আকর্ষণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

এই সংকট শুধু প্রথাগত ফেস্টিভ্যাল ফান্ডের অভাব নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং জায়ান্টগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট। যদিও ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন কন্টেন্টের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার তৈরি করেছে, বাংলাদেশি নির্মাতারা প্রায়শই বিশ্বমানের প্রযোজনা ডিজাইন, বিপণন কৌশল এবং আন্তর্জাতিক কপিরাইট ব্যবস্থাপনার অভাবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। World Bank-এর 'সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্প উন্নয়ন' বিষয়ক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত দুর্বলতা একটি প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে, চলচ্চিত্র ফান্ডের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া, প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব প্রকট। এই দুর্বলতা ফেস্টিভ্যালগুলোর কিউরেটর এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর কন্টেন্ট অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রকল্পগুলোকে কম আকর্ষণীয় করে তুলছে, যা অর্থায়নের সুযোগকে আরও সীমিত করে তুলছে।

অন্যদিকে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) কর্তৃক প্রকাশিত 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন এশিয়া' শীর্ষক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো তাদের চলচ্চিত্র শিল্পে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেল এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সফল হলেও, বাংলাদেশে এই ধরনের মডেলের প্রয়োগ সীমিত। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতারা প্রায়শই ব্যক্তিগত ঋণ, পারিবারিক অর্থায়ন বা সীমিত সরকারি অনুদানের উপর নির্ভর করেন, যা আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণে পর্যাপ্ত নয়। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো যদিও স্থানীয় কন্টেন্টের জন্য বাজার তৈরি করেছে, তাদের বিনিয়োগের মডেল প্রায়শই 'অ্যাকুইজিশন বেজড' অর্থাৎ নির্মিত চলচ্চিত্র কেনার উপর নির্ভরশীল, যেখানে 'প্রোডাকশন ইনভেস্টমেন্ট' বা নির্মাণকালে বিনিয়োগের সুযোগ কম। এর ফলে, আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা বা ফেস্টিভ্যাল ফান্ডের মাধ্যমে প্রাথমিক অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্য উচ্চমানের কন্টেন্ট নির্মাণও কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে, যেখানে সঠিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে না।

অর্থায়নের উৎস ২০১৮-২০১৯ (আনুমানিক শতাংশ) ২০২০-২০২১ (আনুমানিক শতাংশ) ২০২২-২০২৩ (আনুমানিক শতাংশ)
বাংলাদেশ সরকারের অনুদান ৮% ১১% ৯%
ব্যক্তিগত/দেশীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ৭৫% ৬৮% ৬২%
আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল ফান্ড/সহ-প্রযোজনা ২% ৩% ৪%
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম (প্রোডাকশন ইনভেস্টমেন্ট) ০% ১% ২%
অন্যান্য (ব্যাংক ঋণ, পারিবারিক অর্থায়ন) ১৫% ১৭% ২৩%

উৎস: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC) এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অনানুষ্ঠানিক সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'চলচ্চিত্র শিল্প উন্নয়ন তহবিল আইন' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যেখানে World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় একটি ৫০ মিলিয়ন ডলারের স্টার্টআপ ফান্ড তৈরি করা হবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট, স্ক্রিনপ্লে রাইটিং এবং আর্লি-স্টেজ প্রোডাকশনের জন্য সুনির্দিষ্ট অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হবে, যা আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করবে।
  • তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি 'আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার উন্নয়ন ইউনিট' (International Film Market Development Unit) প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা কান, বার্লিন, ভেনিস, বুসান এবং টরন্টো ফিল্ম মার্কেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষ বুথ স্থাপন, প্রজেক্ট পিচিং সেশন আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক প্রযোজনা সংস্থা ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সাথে B2B (বিজনেস টু বিজনেস) সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করবে। এই ইউনিট আন্তর্জাতিক কপিরাইট আইন ও চুক্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পরামর্শ প্রদান করবে।
  • বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC)-কে পুনর্গঠন করে এটিকে একটি 'চলচ্চিত্র বিনিয়োগ ও সহ-প্রযোজনা হাব'-এ রূপান্তরিত করা হোক, যেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রদান করা হবে। এতে করে বিদেশি প্রযোজকদের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনার ক্ষেত্রে কর সুবিধা ও ভিসা প্রক্রিয়ায় দ্রুততা আনা হবে, যা বিদ্যমান চলচ্চিত্র নীতিমালাকে আরও কার্যকর করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারদিন খান

ফারদিন খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সিনেমা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator