জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য: ঘূর্ণিঝড়-বন্যা পরবর্তী রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য: ঘূর্ণিঝড়-বন্যা পরবর্তী রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য: ঘূর্ণিঝড়-বন্যা পরবর্তী রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি
জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য: ঘূর্ণিঝড়-বন্যা পরবর্তী রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের মে মাসে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মোখা, যদিও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সক্ষম হয়েছিল, তবুও এর পরবর্তী সময়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ...

২০২৩ সালের মে মাসে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মোখা, যদিও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সক্ষম হয়েছিল, তবুও এর পরবর্তী সময়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রস্তুতির দুর্বল দিকগুলো আবার সামনে এনেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী দুই সপ্তাহে উপকূলীয় জেলাগুলোতে প্রায় ১৫,০০০ এর বেশি মানুষ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০। এই পরিস্থিতি কেবল ঘূর্ণিঝড় মোখা-পরবর্তী নয়, বরং প্রতি বছরই বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর একই ধরনের স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে দেশের জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষত, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশন ব্যবস্থার ভেঙে পড়া এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ভিড়ের কারণে সংক্রামক রোগের দ্রুত বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব একটি পুনরাবৃত্ত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো, যেমন প্রলম্বিত বন্যা ও তীব্র ঘূর্ণিঝড়, বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC) এর অধীনে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সাড়া প্রদান এবং সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনায় প্রায়শই ঘাটতি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বন্যা কবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অস্থায়ী শৌচাগার স্থাপন করা একটি প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (ICDDR,B) এর গবেষণায় দেখা গেছে, বন্যার সময় প্রায় ৭০% পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে দূষিত পানি পানের কারণে। উপরন্তু, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর অধীনে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো, বিশেষ করে গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে, দুর্যোগকালীন সময়ে প্রায়শই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে বড় বাধা তৈরি করে। এই কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ঔষধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবও একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) যদিও দেশে ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তবে দুর্যোগকালীন সময়ে জরুরি ঔষধের সরবরাহ চেইন অক্ষুণ্ণ রাখা এবং নকল ঔষধের বিস্তার রোধে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে, যা জনস্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIMH) এর সীমিত সক্ষমতা এবং দুর্যোগ-কবলিত অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যক্রমের অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দুর্যোগের শিকার ব্যক্তিরা, বিশেষ করে শিশু ও নারীরা, দীর্ঘমেয়াদী মানসিক আঘাতের শিকার হন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) সংক্রামক রোগ নজরদারি ও গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও, দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি পূর্বাভাস এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মডেলিংয়ে আরও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন। তাদের বিদ্যমান ডেটা সংগ্রহের পদ্ধতি প্রায়শই ম্যানুয়াল এবং সময়সাপেক্ষ হওয়ায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে। এছাড়া, ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ-এর মাধ্যমে জুনোটিক রোগের (যেমন, বন্যার পর লেপটোস্পাইরোসিস) নজরদারিতে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের অভাবও একটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা। এই রোগগুলো মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে এবং প্রতিরোধে বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায়, প্রতিটি অঞ্চলের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপট-ভিত্তিক প্রস্তুতি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা অপরিহার্য। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকরী সমন্বয় ছাড়া এই ধরনের প্রস্তুতি কার্যকর করা সম্ভব নয়।

দুর্যোগ-পরবর্তী জনস্বাস্থ্য সংকটের চিত্র (২০২০-২০২২)
বছর প্রধান দুর্যোগ আক্রান্ত জেলার সংখ্যা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত (আনুমানিক) শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত (আনুমানিক) মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রাপ্তির হার (%)
২০২০ দীর্ঘমেয়াদী বন্যা ২৫ ১,২০,০০০+ ৩৫,০০০+ ৫%
২০২১ ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ১০ ৩০,০০০+ ১০,০০০+ ২%
২০২২ সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা ৬ ৮০,০০০+ ২৫,০০০+ ৩%

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও IEDCR এর বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি 'জাতীয় দুর্যোগ স্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়া নির্দেশিকা' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যেখানে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ-পূর্ববর্তী ঔষধ ও স্বাস্থ্য সরঞ্জাম মজুদের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং DGDA এর মাধ্যমে জরুরি ঔষধের সরবরাহ চেইন অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বিশেষ প্রোটোকল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • IEDCR এর সক্ষমতা বাড়াতে অত্যাধুনিক ভূ-স্থানিক তথ্য পদ্ধতি (GIS) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক মডেলিং টুলস ব্যবহার করে দুর্যোগ-পরবর্তী রোগ প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক, যা DGHS কে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত জনস্বাস্থ্য দল মোতায়েন এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য আগাম পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIMH) এর উদ্যোগে একটি 'দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি' চালু করা হোক, যা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রশিক্ষণ দেবে এবং MOHFW এর অধীনে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিলিং সেবার জন্য নির্দিষ্ট একজন প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের বিধান বাধ্যতামূলক করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator