এআই-এর দ্বিমুখী অস্ত্র: ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের চ্যালেঞ্জ ও মিসইনফরমেশনের নতুন কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এআই-এর দ্বিমুখী অস্ত্র: ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের চ্যালেঞ্জ ও মিসইনফরমেশনের নতুন কৌশল

তানজিনা ইয়াসমিন  avatar   
তানজিনা ইয়াসমিন
এআই-এর দ্বিমুখী অস্ত্র: ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের চ্যালেঞ্জ ও মিসইনফরমেশনের নতুন কৌশল
এআই-এর দ্বিমুখী অস্ত্র: ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের চ্যালেঞ্জ ও মিসইনফরমেশনের নতুন কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া খবর ও ডিপফেক ভিডিওর...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া খবর ও ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এআই-জেনারেটেড কন্টেন্ট ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ছয় মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভুয়া তথ্যের প্রায় ৪০% এর পেছনে এআই-এর ভূমিকা ছিল, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি ইঙ্গিত মাত্র; এআই-এর সূক্ষ্ম ও দ্রুত বিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এআই-এর উত্থান তথ্য যাচাই প্রক্রিয়াকে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একদিকে, এআই-ভিত্তিক টুলস ফ্যাক্ট-চেকারদের জন্য একটি শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে। দ্রুত ডেটা বিশ্লেষণ, প্যাটার্ন শনাক্তকরণ এবং অসংখ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এটি ভুয়া খবর শনাক্তকরণের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) ব্যবহার করে এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবাদের উৎস, ভাষা এবং বিষয়বস্তুর অসঙ্গতি খুঁজে বের করতে সক্ষম। এটি সন্দেহজনক কন্টেন্টকে চিহ্নিত করে ফ্যাক্ট-চেকারদের সময় সাশ্রয় করে এবং তাদের আরও জটিল বিশ্লেষণের জন্য প্রস্তুত করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এআই-এর মাধ্যমে তথ্য যাচাইকরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে তা নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তবে, এই প্রযুক্তির সুষম বন্টন এবং প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক দেশই এর পূর্ণ সুবিধা নিতে পারছে না, যার ফলে ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে, এআই নিজেই মিসইনফরমেশন ছড়ানোর এক নতুন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাস্তবসম্মত ভিডিও, অডিও এবং ছবি তৈরি করা হচ্ছে, যা আসল এবং নকলের মধ্যে পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব করে তুলছে। এমনকি প্রশিক্ষিত চোখও অনেক সময় এআই-জেনারেটেড কন্টেন্টের সূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো ধরতে ব্যর্থ হয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন স্ট্র্যাটেজিতে এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এআই-জেনারেটেড মিসইনফরমেশন আর্থিক বাজার থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, যখন কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন এআই-এর মাধ্যমে দ্রুত গুজব ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সহজ হয়ে পড়ে, যা সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ। বাংলাদেশে, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এআই-এর এই অন্ধকার দিক নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বারবার সতর্ক করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে, বিদ্যমান আইন ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এই দ্রুত পরিবর্তনশীল হুমকির মোকাবিলায় অপ্রতুল।

এআই-এর মাধ্যমে তৈরি ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং এর মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সক্ষমতা:

বছর এআই-জেনারেটেড মিসইনফরমেশন দ্বারা প্রভাবিত দেশের সংখ্যা এআই-ভিত্তিক ফ্যাক্ট-চেকিং টুল ব্যবহারকারী দেশের সংখ্যা মিসইনফরমেশন শনাক্তকরণে গড় নির্ভুলতা (%)
২০২০ ৩২ ১০ ৬৫
২০২১ ৪৫ ১৫ ৬৮
২০২২ ৬০ ২২ ৭১
২০২৩ ৮৫ ৩০ ৭৩
২০২৪ (প্রাক্কলিত) ১১০ ৩৫ ৭৫

উৎস: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি রিপোর্ট, ২০২৩-২৪ (প্রাক্কলিত তথ্য)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার-কে অবিলম্বে 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন'-এর অধীনে এআই-জেনারেটেড মিসইনফরমেশন ও ডিপফেক কন্টেন্ট তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক বিধান প্রণয়ন করতে হবে এবং বিটিআরসি-কে এই ধরনের কন্টেন্ট দ্রুত চিহ্নিত ও অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ও জনবল সরবরাহ করতে হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) যৌথভাবে একটি জাতীয় এআই ফ্যাক্ট-চেকিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করবে, যা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি-এর প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে এআই-ভিত্তিক টুলস ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণে কাজ করবে এবং দেশের গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর মাধ্যমে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে এআই লিটারেসি এবং মিডিয়া লিটারেসি বিষয়ে পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা এআই-জেনারেটেড কন্টেন্ট সম্পর্কে সচেতন হয় এবং ভুয়া তথ্য যাচাই করার প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিনা ইয়াসমিন

তানজিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিসইনফরমেশন ও ফ্যাক্ট-চেকিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator