বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

সালাহউদ্দিন আহমেদ  avatar   
সালাহউদ্দিন আহমেদ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২২ সালের নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ইকোনমিক রিজিলিয়েন্স ইন এ চ্যালেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড' শীর্ষক প্রতিবেদন...

সম্প্রতি, ২০২২ সালের নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ইকোনমিক রিজিলিয়েন্স ইন এ চ্যালেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড' শীর্ষক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং এর কূটনৈতিক প্রভাব বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষত, কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি, খাদ্য ও অত্যাবশ্যকীয় প্রযুক্তি পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিভিন্ন দেশ এখন তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলকে কৌশলগত স্থিতিশীলতার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে। এই প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে একটি 'সাপ্লাই চেইন রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ' গঠনের প্রস্তাব করেছে, যা আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো সংস্থাগুলোর জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যবহার করা, যেখানে কারিগরি মান, উৎপাদন ক্ষমতা ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কগুলো জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল কূটনীতির বর্তমান ধারা শুধুমাত্র বাণিজ্য চুক্তি বা ট্যারিফ আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন এবং আঞ্চলিক প্রভাবের একটি জটিল আন্তঃসম্পর্কিত ক্ষেত্র। উদাহরণস্বরূপ, সেমিকন্ডাক্টর চিপের উৎপাদন ও সরবরাহের উপর চীনের নিয়ন্ত্রণ কমানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো 'চিপ ফোর অ্যালায়েন্স' গঠন করেছে, যা প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের একটি প্রত্যক্ষ কূটনৈতিক পদক্ষেপ। এই জোটের মাধ্যমে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো দেশগুলোকে একত্রিত করে একটি বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যেখানে প্রতিটি সদস্য দেশ প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও উৎপাদন সক্ষমতা ভাগ করে নিচ্ছে। অন্যদিকে, খাদ্য সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ভারত ও ব্রাজিলের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির সাথে নতুন সরবরাহ চুক্তি সম্পাদন করছে, যা ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এক্ষেত্রে, UN Peacekeeping মিশনগুলো প্রায়শই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক সহায়তা ও খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে জটিল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীলতার গুরুত্ব পুনরায় প্রমাণ করে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো, যারা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভুগছে, তাদের জন্য জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির বিকল্প উৎস এবং স্থিতিশীল সরবরাহ পথ খুঁজে বের করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। সার্ক, তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ সত্ত্বেও, খাদ্য ও কৃষি পণ্যের আন্তঃআঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার জন্য একটি 'সার্ক ফুড ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা করেছে, যদিও এর কার্যকারিতা এখনও সীমিত। তবে, BIMSTEC, যা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে একত্রিত করে, তার 'মাস্টার প্ল্যান ফর ট্রান্সপোর্ট কনেক্টিভিটি' উদ্যোগের মাধ্যমে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নত করার উপর জোর দিচ্ছে। এই পরিকল্পনায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও সেবার অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যকে গতিশীল করবে। জাপানের মতো দেশগুলো, তাদের 'ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক' কৌশলের অংশ হিসেবে, BIMSTEC দেশগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করে সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে, সরবরাহ শৃঙ্খল শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে, যেখানে প্রতিটি দেশ তার কৌশলগত সম্পদ ও ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশের সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের যেকোনো সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।

অর্থনৈতিক জোট/উদ্যোগ প্রধান লক্ষ্য প্রভাবিত খাত সদস্য দেশ (উদাহরণ) ২০২২-২৩ সালের আনুমানিক অর্থনৈতিক প্রভাব (বিলিয়ন মার্কিন ডলার)
ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'গ্লোবাল গেটওয়ে' ডিজিটাল, জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন শক্তি, পরিবহন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অংশীদার দেশসমূহ ৩০০
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'সাপ্লাই চেইন রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ' গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল করা সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি, খনিজ, ফার্মাসিউটিক্যালস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ২৫০
চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ জুড়ে অবকাঠামো ও বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বন্দর, সড়ক, রেল, জ্বালানি চীন, ১৪০+ অংশীদার দেশ ১০০০+
BIMSTEC 'মাস্টার প্ল্যান ফর ট্রান্সপোর্ট কনেক্টিভিটি' আঞ্চলিক পরিবহন ও লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নত করা সড়ক, রেল, সমুদ্র, বিমান পরিবহন বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ৫০
সার্ক ফুড ব্যাংক আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তা ও জরুরি খাদ্য সরবরাহ খাদ্যশস্য, কৃষি পণ্য বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান ৫

উৎস: মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইউরোপীয় কমিশন, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সার্ক সচিবালয়, BIMSTEC সচিবালয় ও বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'জাতীয় সরবরাহ শৃঙ্খল কূটনীতি সেল' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই সেলকে অবশ্যই BIMSTEC-এর 'মাস্টার প্ল্যান ফর ট্রান্সপোর্ট কনেক্টিভিটি'-এর আওতায় বাংলাদেশের জন্য অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করতে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে।
  • বাংলাদেশকে অবশ্যই UN Peacekeeping মিশনগুলোতে তার অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সংঘাতপূর্ণ ও দুর্যোগ প্রবণ অঞ্চলে মানবিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় একটি আঞ্চলিক হাব হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হবে। এর জন্য, সামরিক ও বেসামরিক লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে 'জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান পরিকল্পনা' (NDRP)-এর অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যৌথ মহড়া ও তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।
  • সার্ক ফুড ব্যাংক-এর কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং সার্ক সনদের ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে খাদ্যশস্যের অবাধ চলাচল ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর প্রোটোকল প্রণয়নে নেতৃত্ব দিতে হবে। এর পাশাপাশি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে আধুনিক গুদামজাতকরণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল অনুসন্ধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সালাহউদ্দিন আহমেদ

সালাহউদ্দিন আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator