শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের ফল? বিদেশে পাড়ি জমানো মেধাবীদের আর্থসামাজিক সমীক্ষা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের ফল? বিদেশে পাড়ি জমানো মেধাবীদের আর্থসামাজিক সমীক্ষা

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের ফল? বিদেশে পাড়ি জমানো মেধাবীদের আর্থসামাজিক সমীক্ষা
শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের ফল? বিদেশে পাড়ি জমানো মেধাবীদের আর্থসামাজিক সমীক্ষা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুযায়ী, দেশের ৪৬টি পাবলিক ও ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত বছর স্নাতক...

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুযায়ী, দেশের ৪৬টি পাবলিক ও ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত বছর স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লক্ষ ২০ হাজার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা বা উন্নত কর্মজীবনের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যেখানে রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা ও শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে পারছে না। এই মেধা পাচার কেবল বৈদেশিক মুদ্রার আয়ে সম্ভাব্য হ্রাস বা জনবলের ঘাটতিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই প্রবণতার গভীরে গেলে দেখা যায়, দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে প্রতি বছর সরকার ও বেসরকারি খাত মিলে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণাগার স্থাপন, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানে। তবে, ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত দক্ষতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ফারাক বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির অভাবে আমাদের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে, যা তাদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও গবেষণার সুযোগের অভাবকে স্পষ্ট করে।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর মাধ্যমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ সত্ত্বেও, উচ্চমানের প্রশিক্ষিত জনবলের একটি অংশ উন্নত সুযোগের সন্ধানে বিদেশে চলে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কারিগরি ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কর্মীরা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে আকর্ষণীয় বেতন ও উন্নত জীবনযাত্রার জন্য স্থানান্তরিত হচ্ছেন। এই মেধা অভিবাসনের ফলে দেশের শিল্প খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনে বাধা দিচ্ছে। উপরন্তু, দেশের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং সেগুলোর অর্থায়ন ও সুযোগ-সুবিধা প্রায়শই অপ্রতুল, যা তরুণ গবেষকদের জন্য বিদেশে পাড়ি জমানোকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর উপর একটি নীরব চাপ সৃষ্টি করছে, যেখানে শিক্ষায় বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল দেশ ভোগ করতে পারছে না।

সাল বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থী (আনুমানিক) STEM বিষয় থেকে স্নাতকোত্তর (%) দেশীয় শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান (স্নাতকোত্তর) (%)
২০১৮ ৫০,০০০ ৩৫% ৬০%
২০১৯ ৬২,০০০ ৩৮% ৫৫%
২০২০ ৫৫,০০০ (কোভিড-১৯ প্রভাব) ৪০% ৫০%
২০২১ ৭৫,০০০ ৪২% ৪৮%
২০২২ ৯৫,০০০ ৪৫% ৪৫%

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন, BANBEIS শিক্ষা পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সংস্থার সংগৃহীত তথ্য।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে, বিশেষত STEM এবং উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি-কে যৌথভাবে দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা দেশীয় গবেষকদের জন্য আকর্ষণীয় ফেলোশিপ, গবেষণা অনুদান এবং উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করবে।
  • Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর আওতায় দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে স্নাতক সম্পন্ন করার পূর্বেই শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং তাদের অর্জিত দক্ষতা দেশের শিল্প চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator