কারিগরি শিক্ষা: সনদসর্বস্বতা থেকে দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি শিক্ষা: সনদসর্বস্বতা থেকে দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি শিক্ষা: সনদসর্বস্বতা থেকে দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
কারিগরি শিক্ষা: সনদসর্বস্বতা থেকে দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দেশের শিল্প ও সেবা খাতের প্রায় ৮০% নিয়োগকর্তা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থ...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দেশের শিল্প ও সেবা খাতের প্রায় ৮০% নিয়োগকর্তা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে সাধুবাদ জানালেও ব্যবহারিক দক্ষতার ক্ষেত্রে প্রায়শই ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এই প্রতিবেদনটি আবারও দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান সনদসর্বস্বতা এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে এর অসামঞ্জস্যতাকে প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। যেখানে বৈশ্বিক চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মনোযোগী হতে হচ্ছে, সেখানে কারিগরি শিক্ষার এই মৌলিক দুর্বলতা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) খাত যুগ যুগ ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুল বাজেট এবং আধুনিক শিল্প প্রযুক্তির সঙ্গে পাঠ্যক্রমের অসামঞ্জস্যতার শিকার। বিশেষ করে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) পরিচালিত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও ল্যাবরেটরি প্রায়শই অনুপস্থিত। এমনকি, যেখানে কিছু যন্ত্রপাতির সরবরাহ আছে, সেখানেও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষকের অভাব প্রকট। BANBEIS-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট শিক্ষকের প্রায় ৩০% পদ শূন্য রয়েছে এবং যারা কর্মরত আছেন, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শিল্প অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জন করছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দলগত কাজ এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার মতো সফট স্কিলগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সনদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কেবল একটি কাগজ ধরিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের প্রকৃত অর্থে কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষতানির্ভর রূপান্তরের জন্য সমন্বিত ও টেকসই নীতিমালার অভাব স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, পলিটেকনিক ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত, যা তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়। যদিও NSDA জাতীয় দক্ষতা যোগ্যতা কাঠামো (NSQF) বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষতাভিত্তিক সনদ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ স্থাপন না হওয়ায়, পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্পের চাহিদা প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে সনদ অর্জন করছে, সে বিষয়ে বাজারে পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ থাকছে না, অথবা চাকরির জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন, তা তাদের অর্জিত সনদ দ্বারা পূরণ হচ্ছে না। এটি একদিকে যেমন উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিকের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য কেবল একটি সনদ থাকলেই হবে না, সেই সনদের পেছনে বাস্তব দক্ষতা থাকতে হবে – এই মৌলিক সত্যটি আমাদের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

সূচক ২০১৬ সাল ২০২১ সাল উৎস
কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ১০ লক্ষ ২০ লক্ষ (প্রায়) BANBEIS
শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর হার ২২% ২৮% BANBEIS
কারিগরি শিক্ষায় মোট বাজেট বরাদ্দ (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের %) ৬.৫% ৮.২% শিক্ষা মন্ত্রণালয়
NSDA-এর অধীনে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ১১০টি ৭৫০টি (প্রায়) NSDA
শিল্প খাতে কারিগরি স্নাতকদের কর্মসংস্থান হার ৪০% ৫০% (আনুমানিক) বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন

উৎস: BANBEIS, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, NSDA এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে 'জাতীয় কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৪' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে এবং শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের জন্য শিল্প অভিজ্ঞতাকে বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA)-কে তাদের জাতীয় দক্ষতা যোগ্যতা কাঠামো (NSQF)-এর বাস্তবায়ন দ্রুততর করতে হবে এবং দেশের সকল কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনতে হবে, যাতে সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতার মূল্যায়ন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয় এবং সনদগুলি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
  • UGC-কে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারিগরি ডিপ্লোমাধারীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও সহজতর ক্রেডিট ট্রান্সফার নীতি এবং বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা কোর্স চালু করতে হবে, যাতে কারিগরি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং তারা কর্মজীবনের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত না হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator