অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পথ

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পথ
অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পথ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডিজিটাল হেলথ স্ট্র্যাটেজি সাপোর্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) ব্যবস্থাপনায় ড...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডিজিটাল হেলথ স্ট্র্যাটেজি সাপোর্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সম্ভাবনা বিশাল, কিন্তু এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখন অসংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলায় ব্যয় হচ্ছে, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যান্সারসহ অন্যান্য অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন, টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম এবং রিমোট মনিটরিং ডিভাইসগুলো রোগ নির্ণয়, ফলো-আপ এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন এক যুগান্তকারী মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা রোগীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয় করছে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভিড় কমাচ্ছে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা অসংক্রামক ব্যাধি ব্যবস্থাপনায় বহুবিধ সুযোগ তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত 'স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩' এবং বিভিন্ন বেসরকারি টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলো কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের ঘরে বসে চিকিৎসা পরামর্শ পেতে সহায়তা করেছে। রিমোট পেশেন্ট মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের শর্করার মাত্রা বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীর রক্তচাপ দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা চিকিৎসকদের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এবং রোগ জটিলতা এড়াতে সাহায্য করছে। এছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে রোগীর স্বাস্থ্য ডেটা বিশ্লেষণ করে রোগের প্রবণতা এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হচ্ছে, যা অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। এই প্রযুক্তিগুলো স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক, কারণ তারা উন্নত ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডিজিটাল বৈষম্য (digital divide), যেখানে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট অ্যাক্সেস, স্মার্টফোন ব্যবহার এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব প্রকট। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যেমন — দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যাহত করে। এছাড়া, সংবেদনশীল রোগীর তথ্য সুরক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো এখনো পুরোপুরি অনুপস্থিত, যা ডেটা গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতার অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, এই সীমাবদ্ধতাগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত ও ব্যাপকভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করলেও, জাতীয় পর্যায়ে একটি সুসংহত ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের গতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে প্রকোপ (২০১৮) ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের হার (২০২২) বিশ্বব্যাংকের NCD প্রকল্পে বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD, ২০২৩-২০২৮)
উচ্চ রক্তচাপ ২৬.১% ১২% ৫০
ডায়াবেটিস ৯.২% ৮% ৪৫
স্থূলতা ২৪.৪% ৫% ৩০
হৃদরোগ ৬.৩% ৭% ৬০

উৎস: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্বব্যাংক (২০২৩)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য নীতিমালা (National Digital Health Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে অসংক্রামক ব্যাধি ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, ডেটা সুরক্ষা প্রোটোকল এবং ইন্টারঅপারেবিলিটি মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এর সমন্বয়ে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যাতে ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাস পায় এবং সবাই ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পায়।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIPM) এর মাধ্যমে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ব্যবহার এবং ডেটা বিশ্লেষণ বিষয়ে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যাতে তারা কার্যকরভাবে অসংক্রামক ব্যাধি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator