মুদ্রানীতির চোরাবালি: সুদের হার বৃদ্ধিতেও কেন থামছে না মূল্যস্ফীতি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মুদ্রানীতির চোরাবালি: সুদের হার বৃদ্ধিতেও কেন থামছে না মূল্যস্ফীতি?

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
মুদ্রানীতির চোরাবালি: সুদের হার বৃদ্ধিতেও কেন থামছে না মূল্যস্ফীতি?
মুদ্রানীতির চোরাবালি: সুদের হার বৃদ্ধিতেও কেন থামছে না মূল্যস্ফীতি?
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পলিসি রেট (রেপো) ৭.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮.০০ শতাংশ করা হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বো...

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পলিসি রেট (রেপো) ৭.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮.০০ শতাংশ করা হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে টানা নয়বার সুদের হার বাড়ানো সত্ত্বেও, ভোক্তা মূল্য সূচক (CPI) এখনও ১০ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর মুদ্রানীতি সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির এই অনড় অবস্থা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মুদ্রানীতির এই কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মূল কারণ হলো, মূল্যস্ফীতির চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে কেবল চাহিদা-উত্থানই একমাত্র উপাদান নয়, বরং সরবরাহ-জনিত এবং কাঠামোগত সমস্যাগুলোও সমানভাবে দায়ী। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য ও কাঁচামালের উচ্চমূল্য বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দামে। উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ (TCB)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের গড় মূল্যবৃদ্ধি ১৫-২০ শতাংশের বেশি, যা সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। উপরন্তু, ডলারের বিনিময় হারের ক্রমাগত অবমূল্যায়ন আমদানি করা পণ্যের মূল্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা স্থানীয় মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের সরবরাহ কমাতে বাধ্য হচ্ছে, যা টাকার মানকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতিকে দমন করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এর উৎস দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এছাড়াও, অভ্যন্তরীণ বাজারে সিন্ডিকেট ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অব্যবস্থাপনা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বা পণ্যের মজুতদারি করে অস্বাভাবিক মুনাফা লুটে নিচ্ছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর কর ও শুল্ক কাঠামোও এক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। কিছু পণ্যের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক বা ভ্যাট আরোপের ফলে উৎপাদকদের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের খুচরা মূল্যে যুক্ত হয়। পাশাপাশি, কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা, বিশেষ করে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, পণ্যের অপচয় বাড়াচ্ছে এবং কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি ব্যাহত করছে। এসব কারণে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাজারের অস্থিরতাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব ফেলছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানি আয়ে কিছুটা প্রবৃদ্ধি থাকলেও, আমদানি ব্যয়ের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়, যা বাণিজ্য ঘাটতি বজায় রাখছে এবং ডলারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

অর্থনৈতিক সূচক ২০২২ (জুন) ২০২৩ (জুন) ২০২৪ (মে)
ভোক্তা মূল্য সূচক (CPI) ৭.৫৬% ৯.৭৪% ৯.৮৯%
পলিসি রেট (রেপো) ৫.৫০% ৬.৫০% ৮.০০%
আমদানি ব্যয় (বিলিয়ন USD) ৭.৯ ৬.০ ৬.২
ডলার বিনিময় হার (BBDT/USD) ৯৩.৪৫ ১০৮.০০ ১১৭.০০

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাজার তদারকি আইন, ২০২২ এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সিন্ডিকেট ও মজুতদারির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যায়। এক্ষেত্রে, প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ অনুযায়ী অসাধু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে BSEC-এর সঙ্গে সমন্বয় করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি শুল্ক ও রেগুলেটরি ডিউটি সাময়িকভাবে হ্রাস করার নীতি গ্রহণ করা উচিত, যা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ লাঘব করতে সহায়ক হবে এবং ভোক্তাদের উপর থেকে বোঝা কমাবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল সুদের হার বৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আরও সক্রিয় হতে হবে এবং Export Promotion Bureau (EPB) এর সাথে সমন্বয় করে রপ্তানি বহুমুখীকরণে কার্যকর প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় ও বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator