ঘরোয়া ফুটবল একাডেমিগুলোর অনুদান সংকট: সম্ভাবনার সলিল সমাধি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঘরোয়া ফুটবল একাডেমিগুলোর অনুদান সংকট: সম্ভাবনার সলিল সমাধি?

কামরুল ইসলাম  avatar   
কামরুল ইসলাম
ঘরোয়া ফুটবল একাডেমিগুলোর অনুদান সংকট: সম্ভাবনার সলিল সমাধি?
ঘরোয়া ফুটবল একাডেমিগুলোর অনুদান সংকট: সম্ভাবনার সলিল সমাধি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৬৪টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় ২৫০টিরও বেশি অননুমোদিত এবং স্ব-অর্...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৬৪টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় ২৫০টিরও বেশি অননুমোদিত এবং স্ব-অর্থায়িত ফুটবল একাডেমির মধ্যে মাত্র ২০% সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রকার আর্থিক অনুদান পেয়ে থাকে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের দেশের ফুটবল প্রতিভার বিকাশে এক গভীর সংকটের অশনি সংকেত। বিশেষ করে, গত অর্থবছরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দকৃত তহবিলের সিংহভাগই যখন জাতীয় পর্যায়ের ক্লাব ও স্টেডিয়াম সংস্কারে ব্যয় হয়েছে, তখন তৃণমূল পর্যায়ের এই একাডেমিগুলো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে, অসংখ্য প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ফুটবলারের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সলিল সমাধি ডেকে আনতে পারে।

এই অনুদান সংকটের মূল কারণ নিহিত রয়েছে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং স্বচ্ছ বন্টন ব্যবস্থার অভাবে। World Bank-এর 'Sport for Development' শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তৃণমূল পর্যায়ের ক্রীড়া একাডেমিগুলোতে বিনিয়োগের অভাব দীর্ঘমেয়াদী ক্রীড়া উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক একাডেমির অভিযোগ, অনুদানের আবেদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় ভরা। অনেক সময় অনুদান পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়, যা তাদের সীমিত জনবল ও আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে। ফলস্বরূপ, যারা প্রকৃত অর্থেই অনুদানের যোগ্য এবং যাদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে, তারা প্রায়শই এই প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হয়। এটি শুধু আর্থিক সংকটই নয়, বরং একাডেমির তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রশিক্ষকদের মনোবলকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, যার ফলে মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান ব্যাহত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি কেবল একাডেমিগুলোর জন্য নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির জন্যও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। Asian Development Bank (ADB)-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ক্রীড়া খাতে কার্যকর বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যখন তৃণমূল পর্যায়ের অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন এই সম্ভাবনাগুলো অপূর্ণই থেকে যায়। অনেক একাডেমি টিকে থাকার জন্য খেলোয়াড়দের কাছ থেকে উচ্চ প্রশিক্ষণ ফি আদায় করতে বাধ্য হচ্ছে, যা দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য ফুটবলে যোগদানের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এভাবে মেধাবী খেলোয়াড়দের একটি বড় অংশ খেলাধুলা থেকে ছিটকে পড়ছে, যা জাতীয় দলের পাইপলাইনকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও নাজুক করে তুলছে।

বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মোট ফুটবল বাজেট (কোটি টাকা) জাতীয় পর্যায়ের ক্লাবের অনুদান (কোটি টাকা) ঘরোয়া ফুটবল একাডেমিগুলোর অনুদান (কোটি টাকা) মোট বাজেটের একাডেমিতে অনুদানের শতাংশ
২০২০-২১ ১২০ ৮৫ ৫ ৪.১৭%
২০২১-২২ ১৩০ ৯২ ৬ ৪.৬২%
২০২২-২৩ ১৪৫ ১০৫ ৭ ৪.৮৩%
২০২৩-২৪ (প্রাক্কলিত) ১৫৫ ১১২ ৮ ৫.১৬%

উৎস: বাংলাদেশ সরকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বার্ষিক প্রতিবেদন ও বাজেট বরাদ্দ।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'জাতীয় ক্রীড়া একাডেমি অনুদান নীতিমালা' প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে, যেখানে তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবল একাডেমিগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুদান প্রাপ্তির সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড এবং স্বচ্ছ বন্টন প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একটি মানসম্মত ফুটবল একাডেমিকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করবে এবং এর জন্য 'উপজেলা ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল' গঠন করে নিয়মিত অর্থায়ন নিশ্চিত করবে।
  • World Bank ও ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'বাংলাদেশ ফুটবল একাডেমি উন্নয়ন প্রকল্প' শুরু করবে, যা অবকাঠামো নির্মাণ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং প্রশিক্ষকদের মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator