সম্প্রতি, ২০২২ সালের শেষার্ধে বাংলাদেশ বন বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে যে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় গত পাঁচ বছরে অন্তত ১৫টি বাঘের চামড়া ও ৩০ কেজি বাঘের হাড় উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে হরিণ শিকার ও পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে প্রায় ২৫০টি, যেখানে দোষী সাব্যস্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। এই পরিসংখ্যান কেবল পাচার হওয়া পণ্যের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, যা সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর গভীর দুর্বলতা এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর অধীনে পরিচালিত বন বিভাগের এই সীমিত সাফল্যের পেছনে রয়েছে পুরনো আইন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার মতো মৌলিক সমস্যা।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশে বেশ কিছু আইন ও বিধিমালা রয়েছে, যার মধ্যে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অন্যতম। এই আইনটি প্রবর্তনকালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে প্রত্যাশিত হলেও, এর প্রয়োগে প্রায়শই জটিলতা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, এই আইনে বন্যপ্রাণী হত্যার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত। কিন্তু, এই আইনের অধীনে দায়েরকৃত মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতি সম্পন্ন। অনেক ক্ষেত্রে, প্রমাণ সংগ্রহের দুর্বলতা, ফরেনসিক পরীক্ষার অভাব এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অভিযুক্তরা সহজেই পার পেয়ে যায়। বিশেষ করে, আন্তঃসীমান্ত বন্যপ্রাণী পাচার রোধে ভারতীয় ও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট। DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) এবং BARI (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর মতো সংস্থাগুলো যদিও সরাসরি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জড়িত নয়, তবে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে টেকসই কৃষিব্যবস্থা প্রচলনে তাদের ভূমিকা রয়েছে। কৃষকদের বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা সম্পদ আহরণ থেকে বিরত রাখতে বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টিতে তাদের গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের অভাব পরিলক্ষিত হয়, যা পরোক্ষভাবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে।
আইনের দুর্বল প্রয়োগের পাশাপাশি, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অন্যান্য প্রাসঙ্গিক গবেষণার অভাবও একটি বড় সমস্যা। BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) এবং BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, সুন্দরবনের অনন্য ইকোসিস্টেমের উপর জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কার্যকলাপের প্রভাব নিয়ে তাদের সম্মিলিত বা সমন্বিত গবেষণা প্রকল্প খুব সীমিত। সুন্দরবনের সংবেদনশীল পরিবেশের উপর লবণাক্ততার প্রভাব, ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের পরিবর্তন নিয়ে গভীরতর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, যা ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। বর্তমান আইনগুলো মূলত অপরাধ দমনের উপর অধিক মনোযোগ দিলেও, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের সুরক্ষা, প্রাকৃতিক করিডোর তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট হুমকির মোকাবিলায় অভিযোজন কৌশলের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরবনের নদী ও খালের দূষণ রোধে এবং অবৈধ চিংড়ি চাষ বন্ধে আইনের দুর্বল প্রয়োগ বন্যপ্রাণীর জীবনচক্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা বাঘ, ডলফিন এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ। পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর অধীনে বন অধিদপ্তর এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাজেট, জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে ভুগছে, যা তাদের সক্ষমতাকে সীমিত করে।
| বিষয়বস্তু | ২০১৮ | ২০১৯ | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | মোট (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|---|---|
| উদ্ধারকৃত বাঘের চামড়া (সংখ্যা) | ৩ | ৪ | ২ | ৩ | ৩ | ১৫ |
| উদ্ধারকৃত বাঘের হাড় (কেজি) | ৫ | ৮ | ৪ | ৬ | ৭ | ৩০ |
| হরিণ শিকার/পাচার মামলা (সংখ্যা) | ৫০ | ৫৫ | ৪৫ | ৬০ | ৪০ | ২৫০ |
| মামলায় দোষী সাব্যস্তের হার (%) | ১২% | ১০% | ১৫% | ৮% | ১০% | ~১১% |
| সুন্দরবনে পর্যটক আগমন (লক্ষ) | ১.৮ | ২.১ | ০.৫ (কোভিড) | ১.৫ | ২.৩ | ৮.২ |
উৎস: বাংলাদেশ বন বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর অধীনে দায়েরকৃত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর অধীনে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে, যা শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ ও উপস্থাপনে বন বিভাগকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
- সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় মানুষের বিকল্প জীবিকা সৃষ্টির লক্ষ্যে DAE, BARI ও BRRI-এর মতো কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর সাথে যৌথভাবে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প হাতে নিতে হবে। এই প্রকল্পগুলো লবণ সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, পরিবেশবান্ধব মৎস্য চাষ এবং ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের প্রসারে গুরুত্ব দেবে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
- আন্তঃসীমান্ত বন্যপ্রাণী পাচার রোধে বাংলাদেশ ও ভারতের বন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত যৌথ অভিযান ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো (যেমন - একটি স্থায়ী যৌথ টাস্কফোর্স) প্রতিষ্ঠা করা। BARC-এর মাধ্যমে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের উপর জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট প্রভাবের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার জন্য একটি ডেডিকেটেড তহবিল ও গবেষণা সেল গঠন করে নীতি নির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা।