ইউরোপের কার্বন কর: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জ ও রপ্তানি কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইউরোপের কার্বন কর: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জ ও রপ্তানি কৌশল

সাদিয়া আফরিন  avatar   
সাদিয়া আফরিন
ইউরোপের কার্বন কর: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জ ও রপ্তানি কৌশল
ইউরোপের কার্বন কর: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জ ও রপ্তানি কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়ায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়...

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়ায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ডিসেম্বরে একটি অভ্যন্তরীণ নীতি পর্যালোচনা সভার আয়োজন করে, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি, পোশাক শিল্পের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা, যা মূলত কার্বন-নিবিড় পণ্য যেমন সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সার, বিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেনকে লক্ষ্য করে ডিজাইন করা হয়েছে, যদিও প্রাথমিকভাবে পোশাক শিল্পকে সরাসরি প্রভাবিত করছে না, তবে এর পরোক্ষ প্রভাব এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ইইউ, বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, তাদের ‘ইউরোপীয় গ্রিন ডিল’-এর অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৫৫% কমানো এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুন করে বিন্যাস করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের CBAM নীতি কার্যকর হলে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর তাৎক্ষণিক প্রত্যক্ষ প্রভাব না পড়লেও, সরবরাহ শৃঙ্খলের (Supply Chain) উপর এর পরোক্ষ চাপ অনস্বীকার্য। উদাহরণস্বরূপ, পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল যেমন ফাইবার, ডাই ও ফিনিশিং কেমিক্যালস যদি CBAM-এর আওতাভুক্ত দেশগুলো থেকে আসে এবং সেগুলোর উৎপাদনে উচ্চ কার্বন নির্গমন ঘটে, তবে সেগুলোর আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাবে। এটি বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে, যা বিশ্ববাজারে পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতিমালার অধীনে ইইউ এই শুল্ক ব্যবস্থাকে 'পরিবেশগত সুরক্ষা' হিসেবে দেখলেও, অনেক উন্নয়নশীল দেশ এটিকে 'সবুজ সংরক্ষণবাদ' (Green Protectionism) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস সীমিত এবং শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইইউ-এর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য একটি নমনীয় রূপান্তরকালীন সময় এবং কারিগরি সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা যায়। ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইইউ-তে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা মন্থর হওয়ার পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়াও, এই ধরনের পরিবেশগত বিধি-নিষেধের আলোচনাও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যা ভবিষ্যত রপ্তানি চুক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই নতুন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের শুধু ইইউ-এর সাথে নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য ফোরামেও পরিবেশগত ও বাণিজ্যিক কূটনীতি জোরদার করা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation) এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোতে বাংলাদেশ পরিবেশগত মানদণ্ড এবং টেকসই উন্নয়নের বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান তৈরির চেষ্টা করতে পারে। BIMSTEC সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কার্বন-নিরপেক্ষ উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তির আদান-প্রদান নিয়ে একটি আঞ্চলিক চুক্তি করা যেতে পারে, যা সম্মিলিতভাবে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হবে। বিশেষ করে, UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় এর ভূমিকা, বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মঞ্চে একটি নৈতিক উচ্চাসন দিয়েছে। এই সুনামকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশগত ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি ন্যায্য রূপান্তর ব্যবস্থার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারে। একই সাথে, দেশের অভ্যন্তরে শিল্পখাতে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর জন্য নীতিগত সংস্কার আনা এবং সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল অনুসন্ধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে, শুধুমাত্র উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে, বরং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও টেকসই করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইইউ এবং অন্যান্য উন্নত বাজারের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে।

বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিশ্বব্যাপী কার্বন নির্গমন হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা (%) BIMSTEC দেশগুলোর নবায়নযোগ্য শক্তি বিনিয়োগ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) UN Peacekeeping এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ (সেনা ও পুলিশ সদস্য)
২০২০ ১৬.৮ -৫ ৪.৫ ৬,৭০০
২০২১ ২০.৫ -৭ ৫.২ ৬,৫০০
২০২২ ২৩.৪ -৯ ৬.০ ৬,৮০০
২০২৩ (প্রাক্কলিত) ২৫.১ -১১ ৬.৮ ৬,৯৫০

উৎস: বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA), UN Peacekeeping Operations, বিশ্বব্যাংক (World Bank)।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইইউ-এর সাথে একটি বিশেষ কারিগরি সহায়তা চুক্তি (Technical Assistance Agreement) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেবে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কার্বন নির্গমন হ্রাসের জন্য প্রয়োজনীয় সবুজ প্রযুক্তি (যেমন – সৌর প্যানেল, বর্জ্য জল পরিশোধন ব্যবস্থা) এবং দক্ষতা উন্নয়নে ইইউ থেকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা যাবে।
  • BIMSTEC-এর অধীনে একটি 'আঞ্চলিক কার্বন ট্রেডিং মেকানিজম' (Regional Carbon Trading Mechanism) বা 'পরিবেশগত মানদণ্ড সমন্বয় ফ্রেমওয়ার্ক' (Environmental Standards Harmonization Framework) গঠনের প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হবে, যা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কার্বন ক্রেডিট বিনিময় এবং টেকসই উৎপাদন পদ্ধতির প্রচারে সহায়ক হবে, এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত ধারণাপত্র তৈরি করে BIMSTEC সচিবালয়ে পেশ করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, UN Peacekeeping-এ তার দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) অধীনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য 'সবুজ রূপান্তর তহবিল' (Green Transition Fund) গঠনের জন্য কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবে, যাতে CBAM-এর মতো বৈশ্বিক কার্বন শুল্কের প্রভাব মোকাবিলায় স্বল্পোন্নত দেশগুলো পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা পায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাদিয়া আফরিন

সাদিয়া আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator