সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাওয়া নতুন কোম্পানিগুলোর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষত, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক অনুমোদিত কিছু আইপিওর ক্ষেত্রে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতির মাধ্যমে নির্ধারিত কাট-অফ প্রাইস এবং পরবর্তীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ধারিত ইস্যু প্রাইস নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গত অর্থবছরজুড়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটির আইপিও পরবর্তী দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, যা সামগ্রিক বাজার আস্থা ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর দৈনিক লেনদেন চিত্রেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, যেখানে নতুন তালিকাভুক্ত শেয়ারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে আসছে।
পুঁজিবাজারে নতুন তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে আইপিওর দর নির্ধারণ একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা কোম্পানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, আর্থিক সক্ষমতা এবং বাজার চাহিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়। বুক-বিল্ডিং পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি ন্যায্য ও বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা উচ্চ দর প্রস্তাব করে কাট-অফ প্রাইস বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য উচ্চমূল্যে শেয়ার কেনার পথ খুলে দিচ্ছে। এই প্রবণতা অনেক সময় কোম্পানির প্রকৃত মূল্যকে ছাড়িয়ে যায়, যার ফলে তালিকাভুক্তির পর শেয়ারের দর টেকসই হয় না এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। এই পরিস্থিতি বিএসইসি-কে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর হতে বাধ্য করছে এবং তারা দর নির্ধারণ পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছে।
এই প্রবণতা শুধু বিনিয়োগকারীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং সামগ্রিক পুঁজিবাজারের প্রতিও তাদের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। যখন একটি নতুন কোম্পানি উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে বাজারে আসে এবং তার শেয়ারের দাম দ্রুত পড়ে যায়, তখন তা নতুন আইপিওতে বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এর ফলে ভালো এবং সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোও বাজারে আসতে দ্বিধা বোধ করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের গভীরতা ও বৈচিত্র্যকে ব্যাহত করে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর মাধ্যমে শেয়ার ডিম্যাটেরিয়ালাইজেশন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলেও, আইপিও দরের অসামঞ্জস্যতা বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কেবল আইপিও দর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনলেই হবে না, বরং কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি, সুশাসন এবং স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদনের উপরও জোর দিতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা সঠিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
| আইপিও নাম (বছর) | ইস্যু প্রাইস (টাকা) | তালিকাভুক্তির প্রথম দিনের দর (টাকা) | বর্তমান বাজার দর (টাকা) | তালিকাভুক্তির পরের ১ম বছর (গড়) |
|---|---|---|---|---|
| জেনিথ ফার্মা (২০১৯) | ২২ | ৪৫.২০ | ৯.০০ | -৫৯% |
| ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স (২০২০) | ১০ | ১৫.৫০ | ৮.৫০ | -১৫% |
| রেনাটা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ (২০২১) | ৭৪ | ৯৬.০০ | ৫৮.০০ | -২১% |
| বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার (২০২১) | ২২ | ৩২.০০ | ১৯.০০ | -১৩% |
| এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন (২০২১) | ৩১ | ৪৫.০০ | ২৫.০০ | -১৯% |
| বেঙ্গল কুরিয়ার অ্যান্ড লজিস্টিক (২০২৩) | ১০ | ৯.২০ | ৭.৫০ | -২৫% |
উৎস: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ও বিভিন্ন আর্থিক সংবাদ সংস্থা। (গড় হিসাব আনুমানিক)
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতির কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দ্বারা নির্ধারিত কাট-অফ প্রাইস ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ধারিত ইস্যু প্রাইসের মধ্যে একটি যৌক্তিক ব্যবধান নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন (যেমন, ফিক্সড প্রাইসের সাথে তুলনা করে একটি নির্দিষ্ট সীমা) প্রণয়ন করা উচিত, যাতে উচ্চ দর প্রস্তাবের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
- ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE)-কে তালিকাভুক্তির পর নতুন কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরপতনের কারণ অনুসন্ধানে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এই সেল নিয়মিতভাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক পারফরম্যান্স এবং বাজার দর পর্যালোচনা করে বিএসইসি-কে প্রতিবেদন জমা দেবে, যা প্রয়োজনে দ্রুত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করবে।
- সিডিবিএল (CDBL) এবং বিএসইসি-কে যৌথভাবে বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও প্রক্রিয়ার ঝুঁকি ও কোম্পানির মৌলিক বিশ্লেষণের গুরুত্ব সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। বিশেষত, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য অনলাইন এবং অফলাইন প্ল্যাটফর্মে কোম্পানির প্রোফাইল, আর্থিক প্রতিবেদন এবং আইপিও ঝুঁকি বিশ্লেষণ সংক্রান্ত সহজবোধ্য তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।