সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী: হাজারীবাগের বিষ কি এখনও বইছে ধলেশ্বরীতে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী: হাজারীবাগের বিষ কি এখনও বইছে ধলেশ্বরীতে?

শাজাহান মিয়া  avatar   
শাজাহান মিয়া
সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী: হাজারীবাগের বিষ কি এখনও বইছে ধলেশ্বরীতে?
সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী: হাজারীবাগের বিষ কি এখনও বইছে ধলেশ্বরীতে?
ছবি: সংগৃহীত
সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) সম্পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে ধলেশ্বরী নদীর পরিব...

সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) সম্পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে ধলেশ্বরী নদীর পরিবেশগত বিপর্যয় ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, যা হাজারীবাগের বুড়িগঙ্গার করুণ দশারই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে বলে পরিবেশ অধিদফতরের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থাপিত এই শিল্পনগরীর সিইটিপি বর্তমানে প্রায় ৬৫% অপরিশোধিত বর্জ্য ধলেশ্বরীতে নির্গমন করছে, যা দৈনিক প্রায় ২১,০০০ ঘনমিটারের মতো। এটি শুধু পরিবেশগত বিপর্যয়ই নয়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে চামড়া ও পাদুকা শিল্পের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১,০৭৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। তবে, প্রায় ১৫৫টি ট্যানারি কারখানার জন্য নির্মিত এই সিইটিপি’র নকশা ত্রুটি এবং দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এটি তার পূর্ণ কার্যক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে, ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট এবং সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অকার্যকারিতা শিল্পনগরীর পরিবেশ দূষণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, বিসিকের অসহযোগিতা এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামো তাদের আধুনিকায়নে বাধা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিসিক কর্তৃপক্ষ সিইটিপি পরিচালনায় ট্যানারি মালিকদের অনাগ্রহকে দায়ী করছে।

ধলেশ্বরী নদী দূষণের ভয়াবহতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী, শিল্প বর্জ্যের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড (যেমন বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড – BOD, কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড – COD) সাভারের সিইটিপি থেকে নির্গত পানিতে বহুলাংশে লঙ্ঘিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যেখানে BOD-এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৫০ মিলিগ্রাম/লিটার, সেখানে নির্গত পানিতে এর মাত্রা প্রায় ৩০০-৪০০ মিলিগ্রাম/লিটার পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। এই দূষণের কারণে নদী তীরবর্তী কৃষি জমি এবং ভূগর্ভস্থ পানিও দূষিত হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও জীবিকাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। চামড়া শিল্পনগরীর জন্য প্রায় ১৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই অব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে 'সবুজ শিল্প' হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং রপ্তানি আদেশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চামড়া ও পাদুকা শিল্পের এই পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বিশেষত, শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চামড়া পণ্যের চাহিদা থাকলেও, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় দেশের এই সম্ভাবনাময় খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না।

সূচক হাজারীবাগ (২০১৬) সাভার (২০২৩) লক্ষ্যমাত্রা
কার্যকর সিইটিপি ক্ষমতা (ঘনমিটার/দিন) ০ ২৫,০০০ (আংশিক কার্যকর) ৪০,০০০
অপরিশোধিত বর্জ্য নির্গমন (ঘনমিটার/দিন) ৩০,০০০+ ২১,০০০+ ০
BOD মাত্রা (মিগ্রা/লিটার) ৬০০-১০০০+ ৩০০-৪০০ ৫০
COD মাত্রা (মিগ্রা/লিটার) ২০০০-৩০০০+ ১২০০-১৫০০ ২০০
ক্রোমিয়াম রিকভারি হার (%) ০ ১৫-২০ ৯৯
চামড়া রপ্তানি আয় (বিলিয়ন USD) ১.১৬ ১.২৪ (২০২২-২৩) ৫.০০ (২০৩০)

উৎস: পরিবেশ অধিদপ্তর, বিসিক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয় অবিলম্বে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) এর আধুনিকীকরণ এবং পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট এবং সলিড বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশোধন করা হবে এবং বিসিককে এর জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী সিইটিপি থেকে নির্গত বর্জ্যের মান কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং নির্গমনের নির্ধারিত মানদণ্ড লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ট্যানারি ও বিসিকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এর আওতায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর সাথে যৌথভাবে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে সিইটিপি'র নকশা ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধনে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করবে এবং ট্যানারি মালিকদের জন্য পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া (যেমন, জিরো লিকুইড ডিসচার্জ – ZLD) গ্রহণে প্রণোদনা প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাজাহান মিয়া

শাজাহান মিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চামড়া ও পাদুকাশিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator