মাটির প্রাণ ফেরাতে 'কভার ক্রপিং': অর্গানিক ফার্মিংয়ের সাইলেন্ট বিপ্লব ও পুষ্টির ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মাটির প্রাণ ফেরাতে 'কভার ক্রপিং': অর্গানিক ফার্মিংয়ের সাইলেন্ট বিপ্লব ও পুষ্টির ভবিষ্যৎ

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
মাটির প্রাণ ফেরাতে 'কভার ক্রপিং': অর্গানিক ফার্মিংয়ের সাইলেন্ট বিপ্লব ও পুষ্টির ভবিষ্যৎ
মাটির প্রাণ ফেরাতে 'কভার ক্রপিং': অর্গানিক ফার্মিংয়ের সাইলেন্ট বিপ্লব ও পুষ্টির ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ৭টি জেলায়, বিশেষ করে বগুড়া, রংপুর এব...

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ৭টি জেলায়, বিশেষ করে বগুড়া, রংপুর এবং দিনাজপুর অঞ্চলে, কভার ক্রপিং বা আচ্ছাদন শস্য পদ্ধতির ব্যবহার গত তিন বছরে প্রায় ২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি শুধু কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিই নয়, মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ফসল উৎপাদনে একটি নীরব বিপ্লবের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত বছর, এই অঞ্চলগুলিতে প্রায় ১৫,০০০ হেক্টর জমিতে ডাল জাতীয় শস্য, যেমন মুগ, মসুর, এবং সরিষা কভার ক্রপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধিতে এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এই পদ্ধতি মাটির ক্ষয় রোধ করে, উপকারী অণুজীবের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব মোকাবিলায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

এই নীরব বিপ্লবের মূল শক্তি নিহিত রয়েছে মাটির পুষ্টিচক্র পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে ধারাবাহিকভাবে কভার ক্রপিং প্রয়োগ করা হয়েছে, সেখানে মাটির কার্বন ধারণ ক্ষমতা (Soil Organic Carbon - SOC) গড়ে ১৫-২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পাবনার ঈশ্বরদীতে BARC-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের জমিতে কভার ক্রপ হিসেবে ধইঞ্চা (Sesbania aculeata) ব্যবহারের ফলে পরবর্তী ধানের ফলন ৭-১০% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইউরিয়া সারের প্রয়োজনীয়তা ২০-২৫% হ্রাস পেয়েছে। এটি কেবল কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ই কমায় না, বরং ফসলের পুষ্টিগুণও বাড়ায়। কভার ক্রপিং মাটির গভীর স্তর থেকে পুষ্টি উপাদানগুলিকে উপরের স্তরে নিয়ে আসতে সাহায্য করে, যা পরবর্তী ফসলের জন্য সহজে উপলব্ধ হয়। এর ফলে, মাটির মাইক্রোবায়াল বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে ফসলের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।

পুষ্টির ভবিষ্যতের দিক থেকে, কভার ক্রপিং অর্গানিক ফার্মিংয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অত্যধিক ব্যবহার মাটির পুষ্টিগুণ হ্রাস করে এবং ফলে উৎপাদিত ফসলেও ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের ঘাটতি দেখা যায়। কভার ক্রপিংয়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত মাটি থেকে উৎপাদিত ফসলগুলি প্রাকৃতিক উপায়ে প্রয়োজনীয় ম্যাক্রো ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট শোষণ করে, যা মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে অপরিহার্য। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যে সকল জমিতে অর্গানিক পদ্ধতি, বিশেষ করে কভার ক্রপিং অনুসরণ করা হচ্ছে, সেখানকার ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট ও ফসফেটের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এটি শুধু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনই নয়, বরং পরিবেশ দূষণ কমাতেও সহায়ক। এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য একটি টেকসই সমাধান প্রস্তাব করে, যেখানে পুষ্টি কেবল পরিমাণের দিক থেকে নয়, গুণের দিক থেকেও উন্নত হয়।

বছর কভার ক্রপিংয়ের আওতাধীন এলাকা (হেক্টর) মাটির জৈব কার্বন বৃদ্ধি (%) রাসায়নিক সার ব্যবহার হ্রাস (%) ফসলের ফলন বৃদ্ধি (%)
২০১৮-১৯ ৮,২০০ ৮.৫ ১০.০ ৪.৫
২০১৯-২০ ১১,৫০০ ১২.২ ১৫.০ ৬.৮
২০২০-২১ ১৫,০০০ ১৫.০ ২০.০ ৮.২
২০২১-২২ ১৮,৫০০ ১৭.৫ ২২.৫ ৯.৫

উৎস: DAE বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২১-২২), BARC গবেষণাপত্র (২০২৩)

সুপারিশ

  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর যৌথ উদ্যোগে, কভার ক্রপিং প্রযুক্তিকে জাতীয় কৃষি নীতিতে (National Agricultural Policy) একটি মূল উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হোক। এর পাশাপাশি, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে সরকারি ভর্তুকি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই পদ্ধতির প্রচারে বিনিয়োগ বাড়ানো হোক, বিশেষ করে জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কে নির্দেশ দেওয়া হোক যেন তারা দেশের বিভিন্ন কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত কভার ক্রপ প্রজাতির একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে এবং এগুলির স্থানীয় জাত উদ্ভাবনে গবেষণা জোরদার করে। এই গবেষণার ফলাফলগুলি BARC এর ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্মে নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হোক, যাতে কৃষকরা সহজে তথ্য পেতে পারে এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় এর অনুমোদনে কার্যকর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental Impact Assessment) নিশ্চিত করা যায়।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে একটি 'জৈব কৃষি মানদণ্ড ও সার্টিফিকেশন আইন' প্রণয়ন করুক, যেখানে কভার ক্রপিং এবং অন্যান্য জৈব পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের জন্য একটি জাতীয় সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া চালু করা হবে। এর ফলে উৎপাদকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে এবং ভোক্তারা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator