ফিফা ফান্ডিং: ঘাসের মাঠে ফুটবলের 'স্বপ্ন' বনাম আমলাতান্ত্রিক 'জট' | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিফা ফান্ডিং: ঘাসের মাঠে ফুটবলের 'স্বপ্ন' বনাম আমলাতান্ত্রিক 'জট'

জাহিদ রিজভি  avatar   
জাহিদ রিজভি
ফিফা ফান্ডিং: ঘাসের মাঠে ফুটবলের 'স্বপ্ন' বনাম আমলাতান্ত্রিক 'জট'
ফিফা ফান্ডিং: ঘাসের মাঠে ফুটবলের 'স্বপ্ন' বনাম আমলাতান্ত্রিক 'জট'
ছবি: সংগৃহীত
২০২২-২৩ অর্থবছরে ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) প্রায় ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল পেয়েছে, যা তৃণমূল ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়...

২০২২-২৩ অর্থবছরে ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) প্রায় ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল পেয়েছে, যা তৃণমূল ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়ন ও জাতীয় দলগুলোর প্রস্তুতির জন্য বরাদ্দকৃত। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন প্রতিভা অন্বেষণ ও প্রশিক্ষণের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তখনই এর সুষ্ঠু ব্যবহার এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষত, ফিফা অ্যাকাউন্টিং রিপোর্ট অনুযায়ী, তহবিলের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রশাসনিক ব্যয় ও অ-খেলোয়াড় সম্পর্কিত কার্যক্রমে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত পরিবর্তনের গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।

এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো ফিফার সদস্য দেশগুলোতে ফুটবলের সার্বিক মানোন্নয়ন, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করা এবং লিগ অবকাঠামো শক্তিশালী করা। তবে, দেখা যাচ্ছে যে, এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়হীনতা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রায় ৩০০টি ফুটবল একাডেমি ও ক্লাব রয়েছে, যাদের অনেকেই আর্থিক সংকটে ভুগছে। অথচ, ফিফার ফরওয়ার্ড ফান্ডের একটি বড় অংশ ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও, স্থানীয় পর্যায়ে নতুন মাঠ তৈরি বা বিদ্যমান মাঠ সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। অনেক ক্ষেত্রে, প্রকল্পের অনুমোদন পেতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল অর্থের সদ্ব্যবহারই বিলম্বিত করে না, বরং প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে ফিফা থেকে পাওয়া ১ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প, যা দেশের ৫টি জেলায় ফুটবল একাডেমি স্থাপনের জন্য নির্ধারিত ছিল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখনও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি, যেখানে World Bank বা ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।

তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ সরকার ও বাফুফের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। ফিফা ফরওয়ার্ড ২.০ এবং ৩.০ প্রোগ্রামের অধীনে প্রাপ্ত তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রযুক্তিগত সহায়তা, মহিলা ফুটবল উন্নয়ন এবং যুব লিগ আয়োজনে ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের তথ্যে দেখা যায়, প্রশিক্ষক নিয়োগ, যুব খেলোয়াড়দের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে এখনও ঘাটতি রয়েছে। অনেক জেলায় এখনও ফিফা অনুমোদিত মানসম্মত প্রশিক্ষকের অভাব প্রকট। এর কারণ হলো, প্রশিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা। ফিফার গাইডলাইন অনুযায়ী, এই তহবিল থেকে খেলোয়াড়দের বুট, জার্সি ও অন্যান্য খেলার সরঞ্জাম কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকে। কিন্তু স্থানীয় ক্লাবগুলো প্রায়শই অভিযোগ করে যে, তারা সময়মতো এই সরঞ্জাম পায় না অথবা মানসম্মত সরঞ্জাম পায় না। এই সমস্যাগুলো ফিফা ফান্ডের কার্যকর বিতরণ এবং মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাবকে সরাসরি প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে একটি সমন্বিত মনিটরিং কমিটি গঠন করলেও, সেই কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে যখন অর্থ ছাড়ের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত হয়। World Bank-এর অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি অর্থ ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়া হয়, সেখানে ফুটবলের ক্ষেত্রে এই বিকেন্দ্রীকরণ এখনও অনুপস্থিত।

কার্যক্রমের ক্ষেত্র ২০১৮-১৯ (USD) ২০২০-২১ (USD) ২০২২-২৩ (USD)
তৃণমূল উন্নয়ন ও একাডেমি ৭০০,০০০ ৮৫০,০০০ ১,১০০,০০০
জাতীয় দলের প্রস্তুতি ও টুর্নামেন্ট ১,২০০,০০০ ১,৫০০,০০০ ১,৮০০,০০০
প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় ১,০০০,০০০ ১,১০০,০০০ ১,৩০০,০০০
প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ ৫০০,০০০ ৬০০,০০০ ৭০০,০০০
মহিলা ফুটবল উন্নয়ন ২০০,০০০ ৩০০,০০০ ৪৫০,০০০

উৎস: ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম রিপোর্ট, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এর মধ্যে একটি ত্রি-পক্ষীয় চুক্তি (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষর করা হোক, যেখানে ফিফা ফরওয়ার্ড তহবিলের প্রতিটি স্তরে অর্থ ছাড়, ব্যবহার ও নিরীক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ (PPA 2006) এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
  • তৃণমূল পর্যায়ে ফিফা ফান্ডের অর্থ সরাসরি স্থানীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা নির্বাচিত একাডেমিগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রেরণের জন্য একটি বিকেন্দ্রীভূত আর্থিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা হোক, যা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত এবং World Bank-এর স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ প্রকল্পগুলোর আদলে একটি স্বতন্ত্র নিরীক্ষা কমিটি দ্বারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
  • ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য ফিফা ফান্ডের কমপক্ষে ৬০% অর্থ বরাদ্দ বাধ্যতামূলক করা হোক এবং এই বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন, ১৯৭৪ (National Sports Council Act, 1974) এর অধীনে গঠিত একটি স্বাধীন টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যার সদস্যরা ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ, প্রাক্তন খেলোয়াড় এবং ADB-এর প্রকল্প বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ রিজভি

জাহিদ রিজভি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator